সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় স্কুল-কলেজ পর্যায়ের গল্প “অবসর”

রবার্ট মুসা, সামনে আসো।

– এই তুমি। হ্যাঁ হ্যাঁ।

– বলো, পরাবৃত্তের আদর্শ সমীকরণ কী?

– জানি না স্যার।

এই উত্তরেও স্যারের মুখে বিশ্বজয় করা হাসি। স্যার সবসময় হাসতেই থাকেন। বোঝার উপায় নেই তিনি রেগে আছেন নাকি মজা করছেন।

– তুমি দেয়ালের ওখানটায় পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকো।

জুয়েল স্যারের মন ভোলানো হাসি দেখলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকাও কষ্টের না। স্যার সবসময় আমাদের তার দেয়া নামে ডাকেন। অবশ্য সবসময় একজনের জন্য এক নাম থাকে না। প্রতিবারই নামের পরিবর্তন হয়। স্যারের মুখে কি এখনও সেই হাসি থাকে। তাঁর মুখে বিষন্নতা দেখতে ভালো লাগবে না। দুদিন আগেই তাঁর স্ত্রী মারা গেলেন। এখন তো কেউ মারা গেলেই আমরা ভাবি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

স্যারের স্ত্রীর নিউমোনিয়া হয়েছিল। করোনায় আক্রান্ত ভেবে ভুল চিকিৎসায় বা বলা যায় বিনা চিকিৎসায়-ই তার মৃত্যু হলো। জুয়েল স্যারের কথা ভাবতেই রফিক চাচার কথা মনে পড়ে যায়। রফিক চাচা কলেজ গেটের সামনে বসে বাদাম বিক্রি করেন। স্যারকে মাঝে মাঝেই চাচার সাথে গল্প করতে দেখা যেত।

স্যার চলে যাবার সময় রফিক চাচা সবসময় বলতেন, “চিন্তা করি না, জীবন পার হইয়াই যায়।”

আমাদের কাছে বাদাম বিক্রি করার পরেও তিনি প্রতিবার একই কথা বলতেন। হয়তো এখনো রফিক চাচা চিন্তা করেন না। আর সত্যিই তো জীবন থাকলে তা পার হয়েই যায়। ব্রেক টাইম শেষ হওয়ার একটু আগে আগে আমরা চাচার কাছে যেতাম বাদাম কিনতে। পাঁচ টাকার বাদাম কিনেই সবাই বাদাম নিয়ে হুড়োহুড়ি শুরু করে দিতাম। সাদিক আর সজীব বাদাম উপরে ছুঁড়ে দিয়ে মুখে পুরে নিত। ওদের যে বন্ধুত্ব আজকাল এমন বন্ধুত্ব দেখাই যায় না। ওরা সবসময় একসাথে থাকতো। এখন যদিও তা সম্ভব হয়ে উঠছে না। দিন পাঁচেক আগে দুজন মিলে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। বেশ হাসিখুশি। ছুটিতে সাদিক তো ফটোগ্রাফি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। শুনলাম কোন যেন প্রতিযোগিতায় নাকি নমিনেশনও পেয়েছে। এই পুরো পরিস্থিতির কোনো প্রভাব তার উপর পড়েছে বলে মনে হয় না।

সজীবদের অবস্থা ঠিক তার উল্টো। অর্থনৈতিক অবস্থা কোনোদিনই ভালো ছিল না। এসময় আরও অবনতি হওয়ারই কথা। এসব নিয়ে ওর কখনো কোনো অভিযোগ ছিল না। সাথে সবসময় একটা ডায়েরী রাখে আর সময় পেলেই টুকটাক লেখালেখি। প্রথম পাতাতেই লেখা, “দারিদ্র্য আছে তাই সমৃদ্ধি আছে; সমৃদ্ধি দেখে দারিদ্র্য ভুলে যাই।”

এখন আমার প্রচুর অবসর। করোনায় আক্রান্ত হয়ে দশদিন হয়ে গেল। হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে কিছু করার নেই। এসময় প্রিয়জনেরও পাশে থাকতে নেই। একা একা এসব ভাবতে ভালোই লাগছে। মাঝে মাঝে নিঃসঙ্গতাও সুন্দর। খুব ইচ্ছা হয় পত্রিকায় আমার একটা কবিতা ছাপা হবে। বাসায় ফিরে আসলে আরো কিছু কবিতা পাঠিয়েই দেব। কখনো কখনো কিছু তীব্র ইচ্ছাও অসুস্থতা ভুলিয়ে দেয়।

আচ্ছা, জীবন কি সুন্দর? যদি চলে যেতেও হয়, তবুও তো কিছু ইচ্ছে ছিল। জীবন না থাকলে তো ইচ্ছে থাকতো না, ইচ্ছে পূরণ হওয়ার আনন্দও থাকতো না। কিছু ইচ্ছে, কিছু স্বপ্ন নিয়ে জীবন মন্দ না তো; হোক তা অপূর্ণ, তবুও তো ছিল।

দরজার কাছে পায়ের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম। ভাবতে ভালো লাগছে এ আমার কোনো প্রিয়জন।