সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় স্কুল-কলেজ পর্যায়ের গল্প- ‘ ভালোবাসার-ক্যাম্পাস ‘

সেদিন ছিলো কলেজ জীবনের প্রথম দিন । কলেজ থেকে আমাদের বাসার দূরত্ব ছিলো প্রায় ৫ কিলো । প্রত্যেকটা ছাত্র ছাত্রীকে এসএসসি পরীক্ষা পাশ করে কলেজে উঠতে হয় , আমিও তার ব্যতিক্রম নয় । স্কুল জীবন শেষ করে আজ থেকে কলেজ জীবনে উঠলাম । এর আগে অবশ্য ভর্তির সব কাজ সম্পন্ন হয়ে একটা সরকারি কলেজে ভর্তি হয়েছি । এর জন্য আমি অনেক আনন্দিত । ঘুম থেকে আজ খুব তারাতারি উঠেছি! কারণ আজ কলেজের প্রথম উদ্বোধনী ক্লাস আছে । গোসল করে , ফ্রেশ হয়ে, জামা কাপড় পরে রওনা হলাম কলেজের উদ্দেশ্যে ।

অবশেষে পৌছে গেলাম, কলেজে প্রবেশ করলাম । প্রবেশ করার পরেই একটা আলাদা অনুভূতি বিরাজ করলো সেই সময় আমার । চারিদিকে সবুজে ভরা মাঠ , বৃক্ষের বটায়ন ছায়ায় ঘিরে রয়েছে পুরো ক্যাম্পাসটাকে । পুরো মাঠ ও ভবনের নিচে ছাত্র ছাত্রীদের বেশ ভিড় ! কলেজের ভবন ছিলো পুরো ক্যাম্পাস জুরে, একতলা কিছু ভবন আর তিনতলা কিছু ভবন । কলেজে সাধারণত ডিপার্টমেন্ট থাকে তিনটা । বিজ্ঞান বিভাগ, ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ এবং মানবিক বিভাগ । আমি ব্যবসায় শিক্ষার ছাত্র । এসএসসি তে বিজ্ঞান বিভাগে ছিলাম, কলেজে নিয়েছি ব্যবসায় শিক্ষা ।

১০:৩০ মিনিটে শুরু হয় আমাদের প্রথম উদ্বোধনী ক্লাস । সবাই নিজ নিজ ক্লাসে রুমে চলে গেল ! কিন্তু আমি সেই সময় বুঝতে পারছিলাম না কোনটা আমার ক্লাস রুম । কারণ ক্যাম্পাসটা একটু বড় ছিলো ! আর সেই সময়ে আমার কোন বন্ধু ছিলো না । ঘুরতে ঘুরতে একটা স্যারের সঙ্গে দেখা, স্যারকে বিভাগের কথা বলতেই স্যার একটা হাত দিয়ে একটা রুমের দিকে দেখিয়ে দিলেন । আমি সেটা অনুসরণ করে এগোচ্ছি, সেইখানে গিয়ে দেখি দুটো রুম ! পরে কিছু না ভেবেই একটা মেয়েকে দরজার সামনে দেখতে পেলাম । বললাম: আচ্ছা এইটা কি কমার্স ডিপার্টমেন্ট ? মেয়েটা বললো হ্যা !! এটাই কমার্স ডিপার্টমেন্টের রুম । আমি তারাতারি করে ঢুকে পড়লাম ক্লাস রুমে। ক্লাসে ঢুকেই দেখি অনেক ছাত্র ছাত্রী , জায়গা প্রায় ব্লক !!পরে একটা জানালার সাথে একটা ফাঁকা বেঞ্চ দেখতে পেলাম ঐ খানে গিয়ে চুপটি করে একাই বসে পড়লাম একদম ভদ্র ছেলের মত ।

অবশেষে ক্লাসে স্যার এলেন, উনি তার পরিচয় দিলেন এবং অনেক কিছুই বললেন । তারপর তিনি একেক জনের পরিচয় নিলেন । আমিও আমার পরিচয় দিলাম । কিন্তু স্যার আমাকে লক্ষ্য করলেন আমি বেঞ্চে একাই বসে আছি! তাই তিনি অন্য বেঞ্চের দুইটা ছেলেকে আমার বেঞ্চে বসার জন্য বললেন । আমার তখন খুব ভালো লাগছিলো, আর মনে মনে ভাবলাম এই স্যারটা অনেক ভালো বটেই । তাদের সঙ্গে পরিচয় হলাম এবং তাঁরাও আমাকে বন্ধু বানালো ! এভাবেই ধীরে ধীরে সবার সঙ্গে পরিচয় হলাম এবং সবাই বন্ধু হয়ে গেলো ।
ক্লাসে মনোযোগ সহকারে স্যারদের কথা শুনতাম, ভালো করে পড়াশোনাও করতাম বাসায় । পরদিন ক্লাসে পড়া ঠিক মত বুঝে দিতাম । এইভাবে স্যার ম্যাডামদের কাছে ভালো একজন ছাত্র হয়ে উঠি ! আমার বন্ধুদের কাছেও এর ব্যতিক্রম নয় । এইভাবেই চলে যায় কিছু মাস ।

একদিন একটা কলেজে নোটিশ আসলো, আগামীকাল “পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা” দিবস উপলক্ষে সকল শিক্ষার্থীদেরকে উপস্থিত থাকার জন্য বিশেষ ভাবে বলা হলো ।
পরদিন আমরা সকল শিক্ষার্থী ও স্যার-ম্যাডাম সহ সবাই মিলে খুব সুন্দর ভাবে আমাদের ক্যাম্পাসটাকে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা করি । অনেক সুন্দর দেখাচ্ছিল ক্যাম্পাসটা ।

আমার মাথায় হঠাৎ করে একটা বুদ্ধি আসলো : আমরা সবাই যদি কিছু কিছু টাকা দিয়ে কিছু ফুলের গাছ ক্যাম্পাসের কিছু জায়গায় রোপন করি তাহলে অনেক সুন্দর লাগবে । সৌন্দর্যটা আরো বৃদ্ধি পাবে ।
আমার এই পরিকল্পনাকে সবাই সমর্থন করে এবং আমরা সবাই মিলে প্রিন্সিপাল স্যারকে গিয়ে এটি বলি । এ কথা শুনে উনি অনেক খুশি হয় এবং আমাদের সবাইকে এগুলো কাজ করার জন্য উৎসাহ দিলো । পরে আমরা সবাই মিলে ক্যাম্পাসের চারপাশে ফুল গাছ লাগালাম । অপরূপ সৌন্দর্য লাগছে পরিবেশটা । এইভাবে পড়াশোনা আর খেলাধুলার মধ্য দিয়ে কাটতে থাকে কলেজ জীবন ।

একাদশ শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা চলে আসলো, আমরা মনোযোগ সহকারে পরীক্ষা দিলাম ।
এরপর দ্বাদশ শ্রেণীতে উঠলাম ! কলেজে রোভার স্কাউট নামে একটি সংগঠন খোলা হয় । আমার কিছু বন্ধু ওখানে ভর্তি হলেন, আমাকেও ভর্তি হতে বললে আমিও ভর্তি হয়ে যাই । রোভার স্কাউট ও স্কাউট সংক্রান্ত অনেক তথ্য জানলাম যেগুলো আমি আগে কখনো জানতাম না । তারপর আমি রোভারের একজন সদস্য হয়ে যাই । অনেক গুরুত্বের সাথে রোভারের কাজ গুলি করি । আমার অনেক ভালো লেগে যায়, আমি অনেক কাজ শিখি ওখান থেকে । রোভার স্কাউট লিডার স্যারের কাছে অনেক দায়িত্ববান ছেলে ও পছন্দের প্রিয় পাত্র হয়ে উঠি । পরে জেলা কতৃক “রোভার মেট কোর্স ” এর আয়োজন করা হয় যেখানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে রোভার ছাত্র ছাত্রীরা আসে । আমিও আমার কলেজ হতে মেট কোর্স করার সুযোগ পাই , যা আমার জীবনে সৃতি হিসেবে রয়ে যায় ।

একজন রোভার হিসেবে আমি দেশের জন্য সার্বিক সেবা মূলক কাজ করব এটা আমার পন ।
কলেজের প্রত্যেকটা স্যার, ম্যাডাম ও ছাত্র ছাত্রীরা আমাদের রোভার স্কাউট কে সাপোর্ট করে । তারপর প্রিন্সিপাল কলেজ কর্তৃক পিকনিক এর আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিলেন । দায়িত্বশীলতার প্রভাব রোভার স্কাউট দলের উপর পরে । লিডার স্যারের নির্দেশে আমরা পুরো ক্যাম্পাসটাকে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা করে সুন্দর ভাবে সাজাই যা মুগ্ধ করার মত । যেটা দেখে কলেজের প্রিন্সিপাল সহ সকলেই মুগ্ধ হয়ে যায় ! তারপর সকাল ১১ টা থেকে সাউন্ড বক্সে শুরু হয় নাচ,গান সহ ইত্যাদি মূলক আনন্দদায়ক মুহুর্ত । আমার তখন খুব ভালো লাগছিলো পরিবেশটা দেখে ! হই হুল্য আর আনন্দের সাথে কেটে যায় সারাদিন, সৃতি হয়ে থাকলো আমাদের কলেজ ও পুরো ক্যাম্পাসটা ।

অবশেষে লেখাপড়া, এইচএসসি পরীক্ষা চলে আসলো । টেস্ট পরীক্ষায় পাশ করে এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছি ।
বন্ধুরা সবাই মিলে ভালো রেজাল্ট করার উদ্দেশ্যে কোচিং ও করলাম ।
সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য, কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের মাঝে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ালো “করোনা ভাইরাস ” নামে এক ভাইরাস । যেটি দ্বারা বিশ্ব আজ হুমকির মুখে পড়েছে । সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজ বন্ধ, নেই আর স্কুল, কলেজে বিদ্যাপীঠ !! পরীক্ষা পিছানো হয়েছে, ঘরে থেকেই পড়াশোনা করতেছি ।
ভালোবাসার সেই কলেজ ক্যাম্পাসটাকে অনেক মিস করি ! মিস করি সৃতি জাগ্রত প্রিয় স্যার, ম্যাডাম ও বন্ধুদেরকে।

” যদি নিস্তার পাই এই মহামারী থেকে, তবে ফিরে যাবো আমার ঐ বিদ্যাপীঠে ” ।