সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় স্কুল-কলেজ পর্যায়ের গল্প- ‘সেই মেয়েটা ‘

হৃদয়ের আকর্ষণ যখন অজানা শক্তিতে বাধাহীন হয়ে মুক্ত আকাশে ডানা মেলে তখনই তা ভালোবাসায় রূপ নেয়। যৌবনের উত্তাল তরঙ্গে ফোয়ারার বাঁধভাঙ্গা স্রোতের মতো ছুটে বেড়ায় হৃদয়। এই সময় হৃদয় কখন যে কার মনের গহীনে হারিয়ে যায় তার খোঁজও পাওয়া যায় না।

বিষণ্ণ প্রভাত। পাখির কিচিরমিচির ডাকের জোরও এই বিষণ্ণতার আড়ালে চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু স্টুডেন্টদের তো আর ফুরসত নেই। অবসর নেই এই বিষণ্ণ প্রকৃতির অবসাদকে তুচ্ছ করে ভালোবাসার হাত ধরে ঘুরে বেড়ানোর। তাদের তো স্কুল-কলেজ আছে। কিন্তু ভালোবাসাকে তো আর কোনো বাধা দিয়ে ঠেকানো যায় না।

শত শত কলেজ স্টুডেন্টের মতো মুন্নিও চলছে কলেজের উদ্দেশ্যে। অষ্টাদশী যুবতী, চেহারায় মায়া একরাশ। কোনো শিল্পীর রং-তুলিতে সৃষ্ট অমর সাহিত্যকর্মের চেয়ে কোনো অংশেই কম যায় না সে। স্বাভাবিকভাবেই পুরুষের হৃদয়কে আকর্ষণ করার মতো অবস্থা। কিন্তু আজ ব্যাপারটা একটু বেশিই গড়িয়ে গেল। কলেজের গেট পেরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই রিফাতের ডাক কানে এল।

– “ঐ সুন্দরী! এদিকে আসো।”

মুন্নি একটু বিরক্ত হয়েই বলল, “কি হইছে? ডাকছেন কেন?”

– “তোমার রূপের ঝলক দেখে কি আর না ডেকে থাকতে পারি?”

– “এক্সকিউজ মি! দয়া করে বিরক্ত করবেন না। নাহলে আমি প্রিন্সিপালের কাছে বিচার দিতে বাধ্য হব।”

এটা বলেই চুলগুলো বাতাসে উড়িয়ে চলে গেল ক্লাসরুমের দিকে। রিফাত মুগ্ধদৃষ্টিতে সেদিকে চেয়ে রইল। আশেপাশের বন্ধুরা ধাক্কা দিয়ে বলল, “কিরে? প্রেমে পড়লি নাকি?”

“প্রেম না খালি! ডাইরেক্ট দিল চুরি কইরা নিয়া গেছে”, মুচকি হাসি রিফাতের ঠোঁটের কোণে।

ক্লান্ত দুপুর। প্রকৃতির অবসন্নতার চেয়েও বড় ক্লান্তি কলেজ ছুটি হওয়া স্টুডেন্টদের মনে। কলেজের ক্লাসের ঝাক্কি সামলানো তো আর সোজা কথা না! কলেজ ছুটি শেষে মুন্নিও রাজ্যের অবসাদ নিয়ে বাড়ি ফিরছিল। কিন্তু কেমন লাগে যদি এই অবসন্নতার মাঝে আরেক আপদ এসে হাজির হয়?

কিন্তু অপছন্দ ঘটনাই হয়তো জীবনে বেশি ঘটে থাকে। তেমনি হঠাৎ রিফাতের অপ্রত্যাশিত ডাকটাও কানে ভেসে আসল। ভেবেছিল ইগনোর করে চলে যাবে। কিন্তু ওই রিফাতটা এসে পথ আগলে দাঁড়াল। মিষ্টি হেসে বলল, “তা কোথায় যাচ্ছো জানু? এগিয়ে দেওয়া লাগবে?”

মুন্নি ভ্রুকুটি করে বলল, “দেখেন! ডিস্টার্ব করছেন কেন বারবার?”

– “তোমার প্রেমে পাগল হয়েছি যে।”

– “দেখেন, আপনার বায়োডাটা আমি জানি। এলাকার গুন্ডা-মাস্তানগুলার একজন আপনি। তাই আমার কোনো শখ নাই আপনার সাথে প্রেম করার।”

এটা বলেই মুন্নি রিফাতকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। হঠাৎ রিফাত মুন্নির হাতটা চেপে ধরল। মুন্নি অবাক হয়ে পিছনে তাকাতেই রিফাত বলল, “ভালোবাসার জন্য আমি যেকোনো কিছু বিসর্জন দিতে পারি। আচ্ছা যদি আমি গুন্ডামি ছেড়ে দেই তাহলে কি তুমি আমায় ভালোবাসবে?”

মুন্নি মুচকি হেসে বলল, “আগে ছাড়ুন, পরে দেখা যাবে।” এই হাসির তোড়েই মুখরিত হয়ে মুন্নি বাসায় চলে গেল। আর এদিকে রিফাত মন্ত্রমুগ্ধের মতো দাঁড়িয়ে রইল। মনে প্রেমের বাজনা বাজছে!!!

এসব কথা মনে পড়তেই চোখে অশ্রু চলে আসল রিফাতের। তিনটা মাস পার হয়ে গেল মুন্নির মৃত্যুর পর। কিন্তু রিফাত ঠিকই তার কথা রেখেছে। ভালোবাসার টানে ছেড়ে দিয়েছে সব গুন্ডামি। কিন্তু হয়তো মুন্নি জানত যে সে আর বেশিদিন বাঁচবে না; তাই সেদিন এত হেঁয়ালিভরা মন্তব্য করল।

কিন্তু মৃত্যুর নির্মমতাও হয়তো প্রকৃত ভালোবাসাকে থামাতে পারে না। এজন্যই রিফাত এখনো মুন্নির কবরের পাশে অপেক্ষা করে। না! না! মুন্নির ফেরার প্রতীক্ষা নয়। রিফাতের নিজের আত্মা বের হওয়ার প্রতীক্ষা; ইহকালে না হোক, অন্তত যেন পরকালে মিলন ঘটে সেই মেয়েটার সাথে!