সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় স্কুল-কলেজ পর্যায়ের গল্প- `বেদনা’

একদিন কলেজে ক্লাস করছিলাম | তো পিরিয়ডটি ছিল রসায়ন | একে তো একটানা ক্লাস করার ধকল, তার উপর স্যারটাও এতো কঠিন ছিল না | তাই ক্লাসেই একরকম আড্ডার আসর বসিয়ে দিয়েছিলাম | হঠাৎ করেই আমার এক বন্ধু বলে উঠল, “জানিস, আজ আমার মনটা না খুব খারাপ | ” আমরা তো একদম অবাক | ও-ই ছিল আমাদের ক্লাসের সবচেয়ে মজার একজন মানুষ | ও এমনই ছিল যে, ওর মন খারাপ থাকা আর ব্যাঙের সর্দি লাগা প্রায় সমার্থক ঘটনা | তাই সবাই মজা করে ওকে ডাকতাম মানিক |

যাই হোক, অপার বিস্ময় নিয়ে আমরা সবাই বললাম, ” কিরে দোস্ত, কি হইছে তোর? সব খুলে বল আমাদের | ” ও বলল, ” আমার অনেক প্রিয় একজন আজ আমাকে ছেরে চলে গেছে | ” আমি বললাম, ” কিরে এসব কবে ঘটল ? তোর যে এত প্রিয় কেউ আছে আমাদের তো কোনদিন বললি না | কেমন বন্ধু তুই | আচ্ছা, ঠিক আছে | কিভাবে কি হলো সব খুলে বল | দেখি কি করা যায় |” ও বলল, ” শোন তাহলে, একদম প্রথম থেকে বলছি |” আমরা বললাম, ” ঠিক আছে বল | ” ও বলতে লাগল, ” বইছে শীতের হিমেল হাওয়া। সাথে অনেক কুয়াশা | এক মোহময় আবহ সৃষ্টি হয়েছে কুয়াশা পড়ায়। চারিদিকটা একদম ধোঁয়াশা। সেদিন এমনই মায়াবী পরিস্থিতি ছিল। আজকের দিনেও অনেক কুয়াশা | কিন্তু অাজকের দিন আর সেদিন সম্পূর্ণ বিপরীত।
আজ অনেক বড় একটা কিছু হারিয়ে গেছে আমার জীবন থেকে। বারবার মন ডুকরে কেঁদে উঠছে হাহাকার করে। কাল যে ছিল, আজ সে নেই। এভাবে কি করে একজন এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে! আমার কথা কি সে একবারও ভাবল না? সত্যিই পৃথিবীটা নিষ্ঠুর। “
আমরা ভাবলাম, ” আহা, কত বেদনা ওর মনে | আর বন্ধু হয়েও আমরা জানিনা? ধিক্কার দেওয়া উচিত নিজেদের |”আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলাম | ও আরও বলল, “সেদিন সে এসেছিল আমার জীবনে। অনেকের মাঝে তাকে খুঁজে পেয়েছিলাম আমি। প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে যায় তাকে। সেও যেন কেমন শুধু আমারই হয়ে গেল। শীতের হিমেল হাওয়ায় তার ছোঁয়ায় আমি যেন পেতাম উষ্ণ পরশ। এত গুলো দিন সে ছিল আমার সাথে। সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে সে শুধু আমারই ছিল। সব সময় সে আমার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। কিন্তু আজ সে নেই। শত চেষ্টায়ও কান্না থামিয়ে রাখতে পারছি না। আমার অজান্তে কিভাবে যে এতকিছু হয়ে গেল, উত্তরটা জানা নেই আমার, হয়তো জানাও হবেনা কোনদিন।
তবে আমি তাকে কোনদিন ভুলতে পারব না। স্মৃতি হয়েই বেঁচে থাকবে আমার হৃদয়ের গহীন কোণে। শুধু এইটুকুই বলতে পারি, তোমাকে খুব ভালোবাসি “কাতুকুতু বডি লোশন” আজ সকালে সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল। গত বছর এই শীতেই বাজার থেকে অনেক ব্র্যান্ড থেকে বেছে বেছে তাকে কিনেছিলাম। তার সবকিছুই আমাকে মুগ্ধ করেছিল। শীতে সে আমাকে রক্ষা করত। সৃষ্টি করত উষ্ণ অনুভুতির । আজই সর্ব শেষ বারের মত গায়ে মাখতেই শেষ হয়ে গেল আমার প্রিয় ‘’কাতুকুতু  বডি লোশন’’ । এই পৃথিবী কেন এত নিষ্ঠুর! এই দুঃখ আমি কোথায় রাখি ,কাকে বলি?”
সবাই একসাথে বলে উঠলাম, ” কি!!!!!!!!তোর শয়তানি আর কমল না, তাই না ?” এই বলে সবাই মিলে দিলাম তাকে গণধোলাই | একজন বলল, “শালা, কি মনোযোগ দিয়েই না শুনছিলাম আমরা | ভাবছিলাম কি না কি !!  আর তুই??”
আমাদের হইচই দেখে হঠাৎ করে আমাদের শান্তশিষ্ট রসায়ন স্যারটা বিদ্রোহী হয়ে উঠল |  যারা যারা হইচই করছিলাম তাদের সবাকে বাইরে বের করে দিলেন | বাইরে গিয়ে মানিককে আবার গণধোলাই দিলাম |
লকডাউনের মধ্যে বাসায় বন্দি থেকে আজ সেই দিনগুলোর কথা খুব মনে পরে | খুব মিস করি সেই দিনগুলোকে | সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই প্রার্থনা,  আমাদের পৃথিবীকে আবার আগের মতো করে দিন | আমি আমার সেই প্রিয় ক্যাম্পাসে,প্রিয় বন্ধুদের কাছে ফিরে যেতে চাই |