সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় স্কুল-কলেজ পর্যায়ের গল্প- ‘দিনগুলি আমাদের’

আট ফুট প্রাচীরঘেরা ছোট্ট একটি গেট দিয়ে কলেজে ঢুকতেই,ক্যাম্পাস পেরিয়ে যে পাঁচতলা বিল্ডিংটা আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে,সেটিই সাইন্স বিল্ডিং।সাইন্সের ক্লাসগুলো এই বিল্ডিংয়ে হওয়ায় এমন নামকরণ।কলেজ ক্যাম্পাসের পুরো সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে ৬০-৬২ টা সিঁড়ি ভেঙে আপনাকে উঠতে হবে বিল্ডিংটির চতুর্থ তলায়।ব্যস!আপনার কাজ এবার শেষ!এবারে ফ্রন্ট রো থেকে আপনি উপভোগ করতে পারবেন চমৎকার সব মনোরম দৃশ্য।
চতুর্থ তলা থেকে ঠিক উত্তর-পশ্চিম কোনের দিকে তাকালে আপনি দেখতে পাবেন একটি ছোট্ট দোতলা মসজিদ।যোহরের আজান দিলে ঝাঁক বেঁধে একদল ছাত্র নামাজ পড়তে যায়।সাদা কলেজ ড্রেসে একেকজনকে তখন মনে হয় একেকটি সাদা পায়রা।যারা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিয়ে আসবে শান্তি ও স্নিগ্ধতা।
মসজিদের ঠিক পাশেই আছে একটি শহিদ মিনার।একুশে ফেব্রুয়ারিতে ফুলে ফুলে ভরে যায় এই শহিদ মিনারটি।আর বাকি সময় এটি আচ্ছাদিত থাকে লাল রক্তজবা দিয়ে।চারপাশের জবাফুলের গাছ অদ্ভুতভাবে শহিদ মিনারকে ঘিরে থাকে বলে,দূর থেকে মনে হয় ধিকধিক আগুন জ্বলছে শহিদ মিনারটিকে ঘিরে।
এবার যদি চোখটিকে একটু ঘুরিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমে তাকানো হয়,তবে প্রথমেই নজর কাড়বে লম্বা ঝাঁকড়া এক তেঁতুল গাছ।শীতের মৌসুমে শতাব্দীর সাক্ষী এই গাছটার নিচে যে কতবার যাওয়া হয় তেঁতুলের লোভে,তার ইয়ত্তা নেই।যদিও তেঁতুল গাছে ঢিল ছুঁড়তে ভয় পায় সবাই।কে না জানে,তেঁতুল গাছে ভূত থাকে?তবে কুড়িয়ে পাওয়া টক তেঁতুল মুখে পুরে বন্ধুদের সাথে ঘাসের নরম গালিচায় গল্প করার অনুভূতি কোনো ভালোলাগার সাথেই তুলনা করা সম্ভব না।
ক্যাম্পাসেরও যে প্রাণ আছে,সে-ও যে মিষ্টি দুপুরে আলস্য ভেঙে আনন্দোৎসবে মেতে উঠতে সদা প্রস্তুত,তা বোঝা যায় একমাত্র টিফিন পিরিয়ডে।কলেজের সামনে থেকে বুট-বাদাম এনে বন্ধুদের সাথে ভাগ করে নেয়া,ছোট্ট কোনো বিষয় নিয়ে ঝগড়া করা,এসবই যে কতটা অকৃত্রিম,তা একমাত্র এ সময়ে ক্যাম্পাসে বসলেই বোঝা যায়।ক্যাম্পাসের এখানেসেখানে সর্বত্র গোল হয়ে বসে আড্ডা দিতে দেখা যায় সবাইকে।সবাই প্রাণ খুলে হাসে এসময়টাতে।এমন হাস্যোজ্জ্বল ক্যাম্পাস দেখলে মনে হয়,এ বসুন্ধরায় বুঝি আর কোনো দুঃখ নেই।নেই কোনো হতাশা,চাপা কষ্ট।ক্ষণিকের জন্যও এমন সুখ হাতছাড়া করতে চায় না কেউই।
মাঝেমাঝে মনে হয়,কলেজে যাওয়ার মূল কারণটাই বোধ হয় ক্যাম্পাস।ক্যাম্পাস আমাকে আকর্ষণ করে অত্যন্ত তীব্রভাবে।সকাল সকাল কলেজ বাস থেকে নেমে ক্যাম্পাসে পা রাখতেই,সব আলস্য যেন দূর হয়ে যায়।দূরে সরে যায় গতরাতের অনিদ্রার ধকল,সকল ক্লান্তি,কাকভোরে দেখা অদ্ভুত দুঃস্বপ্ন।নিজেকে যেন ফিরে পাওয়া যায় প্রাণের এই ক্যাম্পাসে।শীতের সময় কলেজে ঢুকি জুতো-মুজো হাতে নিয়ে।ঠাণ্ডা করে কি না?করে,কিন্তু তাতে কী?নরম শিশিরভেজা সবুজ ঘাসে পা ডুবিয়ে হাঁটার যে আনন্দ,তার কাছে ও ঠাণ্ডা অতি তুচ্ছ।মাঝেমাঝে ক্যাম্পাসের মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে থাকি চুপচাপ।চোখ বন্ধ করে শুনতে চাই,সবার পদধ্বনি,অস্ফুট সব কথাবার্তা।কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়ানোর সাহস পাই না।’পাছে লোকে কিছু বলে’-এর বৃত্ত থেকে বেরোতে পারি না কোনোমতেই।
প্র‍্যাক্টিক্যাল ক্লাস করতে যাওয়ার সময় ক্যাম্পাস পেরোনোর মুহূর্তে মনে হয়,ল্যাবে যাওয়ার কি খুব দরকার?একদিন না গেলেই কি নয়?কী হবে,একদিন ক্লাস না করে যদি ক্যাম্পাসে সবাই দৌড়োদৌড়ি করি?সবাই মিলে যদি ফুটবল খেলা হয়,তাতে কি এতই ক্ষতি?এ সময়টায় আমি ফুটবলের প্রচণ্ড অভাব অনুভব করি।কেবলই ইচ্ছে হতে থাকে,এখানেই দাঁড়িয়ে প্রাচীরঘেঁষা শিমুল গাছটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে।কিন্তু দাঁড়াতে পারি না।সম্ভব হয় না।শিক্ষকেরা ডেকে নিয়ে যান ল্যাবে।
লবণের ক্ষারীয় আর অম্লীয় মূলক শনাক্ত করতে করতে কখনোবা আনমনে চোখ চলে যায় ক্যাম্পাসের প্রাচীরে।প্রাচীরের গায়ে বছরের পর বছর ধরে লিখে রাখা প্রায় মুছে যাওয়া নামগুলো পড়তে ইচ্ছে করে বারংবার।তবে দৃষ্টি অতদূর প্রসারিত হয় না।বিরসবদনে আবারো মুখ গুঁজতে হয় কাঁচের টেস্টটিউবগুলোর মাঝে।
টেস্টটিউবের ঠুনঠুন ঠোকাঠুকির শব্দ হঠাৎ মনে করিয়ে দেয় কোনো এক বৃষ্টিদিনের কথা।বৃষ্টির ফোঁটা যখন ক্যাম্পাসের মাটির স্পর্শ পেয়ে সোঁদা গন্ধ ছড়াতে থাকে,মনের স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে তার ছবি,তার সুবাস।বৃষ্টি যখন ক্যাম্পাসকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়,তখন আমারও ইচ্ছে হয় ইলেকট্রিক তারের ওপর বসে থাকা শান্ত কাকটির মত কাকভেজা হতে।এরকম ঝুম বৃষ্টিতে ক্লাসের প্রতি মন থাকে না কারোরই।সবার মনোযোগ কেড়ে নেয় রিমঝিম বৃষ্টির শব্দ।এসময় কেবলই আমার মনে বাজতে থাকে ‘চন্দ্রবিন্দু’ ব্যান্ডের গানটি-
“ঘুমঘুম ক্লাসরুম
পাশে খোলা জানালা
ডাকছে আমাকে
তোমার আকাশ!”
সবসময়ই মনে হয় শেষ লাইনে ‘তোমার আকাশ’ এর পরিবর্তে ‘কলেজ ক্যাম্পাস’ হলে গানটা মানাতো আরো বেশি।
কলেজের দিনগুলো কাটছিল ভালোই।কিন্তু,হঠাৎ সব আনন্দ মুহূর্তগুলোকে নিঃশেষ করে দিল মারণঘাতি করোনা ভাইরাস।কলেজে যাওয়া হয়ে ওঠে না অনেকদিন।কতদিন সেই ভালোবাসার ক্যাম্পাসে পাখির কলকাকলি,ডানা ঝাপটানি শুনি না,তাও মনে নেই।বিবর্ণ ক্যালেন্ডারে চোখ বুলিয়ে একটু হিসেব করলে দেখা যায়,কেটে গেছে দীর্ঘ তিন-তিনটি মাস।পরিস্থিতি কতদিনে স্বাভাবিক হবে,তাও যাচ্ছে না বলা।বাসায় বসে বসে একটি বিষয়ে অন্তত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি,এবার ‘পাছে লোকে কিছু বলে’-এর ধার ধারবো না আর।প্রিয় ক্যাম্পাসে যা ভালো লাগে তাই করে বেড়াব।স্বাধীন পাখিটির মত সুবিশাল নীলাকাশে উড়াল দেব।
ইচ্ছে হয়,এখনই অবরুদ্ধ এ জীবন ছেড়ে, কলেজে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেই।কিন্তু তা করাটা ঠিক হবে না একদমই।কিছু ইচ্ছেকে হয়তো অপূর্ণ থাকতে দেয়াই ভালো।
“এমন কি কোনো কথা আছে
যে সব ইচ্ছেই পূরণ হতে হবে?
কিছু ইচ্ছে,কিছু আকাঙ্ক্ষা না হয়
অপূর্ণতার অ্যালবামে স্থান পেল!”