সেরা গল্প লেখক-২০২০ প্রতিযোগিতায় স্কুল-কলেজ পর্যায়ের গল্প- ‘ প্রাণের ভিক্টোরিয়া মিস করি খুব ‘

শুরুটা হয়েছিল ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে।
আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে উঠি। ভর্তি হলাম ভিক্টোরিয়া স্কুলে। আমাদের এখানে একটা রীতি আছে তা হলো ভিক্টোরিয়া স্কুলে ভর্তি হতে পারা মানে বিরাট ব্যাপার।তাই আমি তখন অনেক খুশি ছিলাম। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্টের দিনটা ছিল আর রোমান্ঞকর।সেদিনকার কথা মনে পড়লে এখনও হাসি পায়। ঐদিন হয়ত আমি খেলতেছিলাম। কেউ একজন বলল আমি ভিক্টোরিয়াতে চান্স পাইছি কিন্তু অনেকেই বিশ্বাস করে নাই।যার কারণে আমার ক্ষুদ্র উচ্ছাস, আনন্দগুলো ভিতরেই থেকে যায়।  তাই আমি আর আমার এক বন্ধু সাইকেল চালিয়ে স্কুলের দিকে রওনা হলাম।আমি তখন ভালো সাইকেল চালাতে পারতাম না।তাই পিছনে বসে যাচ্ছিলাম। স্কুলে যাওয়ার পর দেখলাম অনেক ভিড়। ভিড় ঠেলে আমি ভিতরে যেতে পারিনি ঐ বন্ধুই যায় এবং রেজাল্ট দেখে আসে। আমি সেদিন সত্যিই চান্স পেয়েছিলাম এবং ২৪তম হই। অনেক ভালো রেজাল্ট। সকলে এসে প্রশংসা করে তাই একটু লজ্জা লাগছিল। এরপর সেখানেই ভর্তি হই।
আমি স্কুলে অনেক চুপচাপ থাকতাম আর কথা কম বলতাম।যার কারণে আমার খুব কম বন্ধু ছিল। আমার লাইফে যদি সবচেয়ে খারাপ কোনো সময় থাকে তা হলো ক্লাস ৬ এর সময়টা। অর্ধবার্ষিক ও বার্ষিক দুই পরীক্ষা ই আমার রেজাল্ট অনেক খারাপ হয় বিশেষ করে ইংরেজি যদিও ছোট থেকেই এই সাবজেক্টটাই আমি দুর্বল।মোট পয়েন্ট ৪.০৩ আসছিল কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে স্যার ভুল করে ৪.৩০ দিয়ে দেয়। তাই রোল বেশি পিছায় নি। স্কুলের শুরুটা এভাবেই হয়েছিল। এরপর আস্তে আস্তে বড় হতে থাকি। আমার লাইফে সবচেয়ে বেশি মজার ঘটনা ঘটেছে প্রত্যেক পরীক্ষার রেজাল্টের দিন। জেএসসি পরীক্ষার রেজাল্টের দিন খুব চিন্তিত ছিলাম,আম্মু প্রথমে রেজাল্ট দেখে বলে আমার নাকি বিজ্ঞানে এ+ আসে নি। কিন্তু এই পরীক্ষাটা অনেক ভালো হয়েছিল তবুও কাউকে কিছু বলিনি। অনেক কষ্ট পাইছিলাম কিন্তু পরে শুনলাম আমার সবগুলোতেই এ+ আসছে।
জেএসসি পরীক্ষার বৃত্তির রেজাল্টের দিন আমার স্পষ্ট মনে আছে ঐদিন আমি ঘুমাইতেছিলাম। ঘুম থেকে উঠে শুনি আমি বৃত্তি পাইছি। অনেক খুশি হইছিলাম সেদিন।এসএসসি রেজাল্টের দিন আমি বাসার বাইরে ছিলাম। আমি জানতামই না যে রেজাল্ট বের হইছে।পরে শুনছি। ইনশাআল্লাহ সব সাবজেক্টে এ+ পাইছি। এভাবেই স্কুল লাইফটা পার করে ফেলছি। স্কুল লাইফটা যে এত মজার সেটা কাউকে বুঝানো ইম্পসিবল।অন্য স্কুলে হয়ত সেটা কখনোই বুঝা সম্ভব ছিল না।আমাদের স্কুলের ক্যাম্পাস মানে স্কুলের সামনের ছোট্ট মাঠটা। টিফিন পিরিয়ডে সেখানেই খেলত সবাই। অনেকে ক্রিকেট বল নিয়ে যেত আর কয়েকজন মিলে খেলত‌। আমিও একদিন বল নিয়ে গেছিলাম কিন্তু সেদিন কোনো কারণে স্যার বলটা নিয়ে নেয়। আমার খুব চেষ্টা করি নিজের কান্নাটাকে আটকিয়ে রাখতে কিন্তু পারিনি।হয়ত কান্না আটকিয়ে রাখাটা অনৈচ্ছিক ব্যাপার,আমার ইচ্ছার উপর এটা নির্ভর করে না। এভাবেই হাসি, আনন্দে চলতে চলতে কখন যে স্কুল লাইফটা শেষ হয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। এইতো সেদিন গুটি গুটি পায়ে মায়ের হাত ধরে স্কুলের সীমানায় প্রবেশ করলাম অথচ এখন আমার স্কুল লাইফটা আর নেই।
একটা সময় খুব করে চাইতাম কখন স্কুলটা বন্ধ হবে আজ সত্যিই বন্ধ কিন্তু খুব ইচ্ছা করছে সাদা শার্ট, সাদা ক্যাডস,প্যান্ট, পিঠে ব্যাগ বয়ে আবারও রওনা হয় স্কুলের জন্য। আবারও একই সুরে বন্ধুদের সাথে বলি “আমার সোনার বাংলা,আমি তোমায় ভালোবাসি।”আবারও মেতে উঠি আড্ডায়। একটা সময় ছুটির ঘন্টা পড়লে খুব লাফালাফি করতাম,অধীর আগ্রহে থাকতাম কখন মমিন ভাই ছুটির ঘন্টাটা নিয়ে একটানা বাজানো শুরু করবে। এখন আর অধীর আগ্রহ নিয়ে বসে থাকতে হবে না কারণ আমি তো আমার  স্কুল লাইফের সমাপ্তির ঘন্টাটায় বাজিয়ে ফেলেছি।বড্ড মিস করছি স্কুলটাকে।করোনার থাবায় পুরো ‌বিশ্ব আজ থমকে গেছে, বাংলাদেশ যখন‌ ব্যস্ত করোনা প্রতিকূলতা রোধ করতে তখন আমার ক্ষুদ্র হৃদয় অপেক্ষায় কবে দেখতে পাব প্রাণের ভিক্টোরিয়া।হয়ত কাঁধে ব্যাগ নিয়ে সাদা ড্রেস পড়ে স্কুলে আর কখনও যাওয়া হবে না কিন্তু দেখতে তো পাব প্রাণের ভিক্টোরিয়াকে।
সাদা বিল্ডিং,বাগান আর ঘাসে আবৃত সুন্দর মাঠ।এই লকডাউনে হয়ত সবাই নিজের স্কুলকে অনেক মিস করছে কিন্তু আমারটা আলাদা কারণ আমি সেই লাইফটা আর কখনো ফিরে পাব না। কোনো একটা সময় আবারও স্কুল খুলবে, আবারও বেঞ্চগুলো তাদের সঙ্গীকে ফিরে পাবে, আবারও সবাই একসাথে জাতীয় সংগীত গাইবে। কিন্তু আমি আর থাকব না।আমার স্মৃতিগুলো হয়ত থাকবে নয়ত ভুলে যাবে সবাই আমাকে চিরতরে।আগে কখনো বোঝার চেষ্টা করিনি স্কুল লাইফটা কী?স্কুল আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। ভালো শিক্ষা,ভালো বন্ধু,প্রিয় শিক্ষক, সব পেয়েছি। কিন্তু বিনিময়ে আমার কাছ থেকে কিছুই পায়নি। খুব ইচ্ছে করছে আবারও ছুটে চলে যায় সেই স্কুল আঙিনায়। আবারও বেঞ্চিতে বসে প্রিয় শিক্ষকগণের প্রিয় কথাগুলো শুনতে ইচ্ছা করছে। আবারও ইচ্ছা করে বৃষ্টির দিনে গ্রিলে হাত রেখে বৃষ্টি বিলাস করতে। কিন্তু সেটা কখনোই সম্ভব হবে না।
                   তুমি উজ্জ্বল আলোর প্রজ্বলিত রত্ন
                   তুমি  আমার রং তুলিতে আঁকা স্বপ্ন
                   তুমিই জ্বালিয়েছিলে জ্ঞানের প্রদীপ
                  সবারে আলোকিত করে তুমি নির্জীব
                  তুমি আমায় দিয়েছ প্রয়োজনীয় সব
                    ভালোবাসি প্রাণের ভিক্টোরিয়া খুব