সুজনের প্রশ্ন, ‘৫০ হাজার টাকায় বোর্ডে চাকরি করবে রফিক?

প্রায় এক যুগ ধরে বিসিবির কোচ হতে মুখিয়ে থাকা মোহাম্মদ রফিকের কোচ হতে না পারার আক্ষেপ নিয়ে এবার খোলামেলা কথা বলেছেন তারই সাবেক সতীর্থ এবং বর্তমান বিসিবি পরিচালক খালেদ মাহমুদ সুজন।

রোববার জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপে বিসিবি পরিচালক ও গেম ডেভলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান সুজন বলেন, ‘মোহাম্মদ রফিক চাইলে বিসিবির গেম ডেভলপমেন্টের কোচ হতে পারে। গেম ডেভলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে আমি তার জন্য কথা বলব, চাকুরির ব্যবস্থা করব। কিন্তু এর একটি সুষ্ঠু প্রক্রিয়া আছে। আমার প্রশ্ন, রফিক কি সেই নিয়মকানুন মেনে কাজ করতে চাইবে?’

অনেক কথার ভিড়ে সুজন বোঝানোর চেষ্টা করেন, রফিক অনেক বড় খেলোয়ার, তুখোড় স্পিনার। কিন্তু বিসিবির কোচিং প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত হতে গেলে তাকে নির্দিষ্ট নিয়মকানুন মেনেই আসতে হবে। সেখানে কে কত বড় পারফরমার, কার মেধা কত? এর চেয়ে কোচিং ডিগ্রি, অভিজ্ঞতা ও কাজের মূল্যায়ন অগ্রগণ্য।

নিজের বোর্ডে কোচিং করানোর সময়ের প্রসঙ্গ টেনে সুজন বলেন, ‘আমি প্রথম চার বছর বোর্ডে ২৫ হাজার টাকা মাসিক বেতনে চাকরি করেছি। আমি জানি বোর্ডের কোচিং করানোর একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। রফিক যত বড় তারকাই হোক না কেন, বিসিবির কোচ হওয়ারও তো একটি মানদণ্ড আছে, নির্দিষ্ট নিয়মকানুন আছে। এখানে একাধিক স্থানীয় কোচ আছেন লেভেল থ্রি করা। বেশিরভাগই লেভেল টু করে ফেলেছেন। তারা বছরের পর বছর কাজ করে একটি পর্যায়ে গিয়ে আজ হয়তো ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পান।’

‘তারপরও আমি গেম ডেভলপমেন্টের চেয়ারম্যান হিসেবে অধিকার নিয়েই বলছি, রফিক যদি বোর্ডের গেম ডেভলপমেন্টে কাজ করতে চায়, আমি তার চাকরির নিশ্চয়তা দিচ্ছি। সে চাকরি পাবে অবশ্যই। কিন্তু ঐ যে বললাম, নিয়ম মেনে ও সুষ্ঠ পথে হেঁটে- তবেই না কাজ করতে হবে।’

‘আমি তো রফিককে হুট করে দেড়-দুই লাখ টাকা বেতন দিতে পারব না। বাবুল ভাই (মিজানুর রহমান বাবুল) লেভেল থ্রি করা কোচ, ওয়াহিদ ভাই (ওয়াহিদুল গনি) দীর্ঘদিন বোর্ডের কোচ হিসেবে কাজ করে আজ হয়তো লাখ খানেক টাকার মত বেতন পান। এখন রফিককে তো আর শুরুতেই দেড়-দুই লাখ টাকা বেতনে নিতে পারব না, তা সম্ভবও না। তাহলে যারা দীর্ঘদিন কাজ করে এত পরিশ্রম করে এখন লাখখানেক বেতন পান, তারা কী ভাববেন? তাদের সঙ্গে অবিচার করা হবে না? তাদেরকে অপমান করা হবে না? কাজেই রফিককে চাইলেও শুরুতে ৫০ হাজার টাকার বেশি বেতন দিতে পারব না।’

সুজন রফিকের কাছে জানতে চান, ‘আমার প্রশ্ন, রফিক কি এই টাকায় কাজ করতে রাজি হবে? আমার জানা মতে কখনওই রাজি হবে না। তিন-চার গুণ অর্থ দাবি করবে। সেটা তো শুরুতে দেয়া কিছুতেই সম্ভব না।’

তিনি যোগ করেন, ‘রফিক আমার প্রায় সমবয়সী। আমরা দীর্ঘদিন একসঙ্গে জাতীয় দলে খেলেছি। তার খেলোয়াড় স্বত্তার ওপর আমার প্রগাঢ় শ্রদ্ধা আছে। আমি জানি কত উঁচু মানের স্পিনার ছিল সে। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। যখন সে কোচিং করাতে আগ্রহী হবে, তখন তো তাকে কোচিংয়ের ওপর পড়াশোনা করতে হবে, ডিগ্রি-ডিপ্লোমা থাকতে হবে।’

‘আমার জানা মতে যারা গেম ডেভলপমেন্টে কাজ করছেন, তাদের অনেকেই লেভেল থ্রি করা। ঐ লেভেল থ্রি তো বহু দূরে, রফিক লেভেল ওয়ানও করেনি। প্রথাগত কোচিং আর মেধাবি ক্রিকেটারের টিপস পরামর্শ এক নয়। আমি জানি রফিক স্পিনারদের অনেক ভাল ও কার্যকর পরামর্শ দিতে পারবে। কিন্তু কোচিং করানো, ছেলেদের স্পিনার বানানোর প্রক্রিয়া শেখানো, সূক্ষ্ণ কলাকৌশল শেখানো এক কাজ নয়। কোচিং করানোর ধারাই আসলে আলাদা।’

‘আমিও দশটি ছেলেকে ব্যাটিং টিপস দিতে পারব। এভাবে ব্যাট ধরো, এভাবে ব্যাটিং করো, এটা করো, সেটা করো। পরামর্শ দেয়া আর ব্যাটিং শেখানো তো এক কথা নয়। তাই তো আমি ব্যাটিং কোচ না। পরামর্শ এক বিষয় আর কোচিং করানো আরেক। আমি জানি রফিকও খুব ভাল টিপস দিতে পারবে। কিন্তু কোচিংটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।’

সুজনের শেষ কথা, ‘আমরাও চাই রফিক কাজ করুক। কিন্তু ওকে আগে পরিষ্কার করে জানাতে হবে ও কীভাবে কাজ করতে চায়? স্পেশালিস্ট কোচিং করাতে চায়? মানে স্পিনারদের নিয়েই শুধু কাজ করতে আগ্রহী? নাকি ফুলটাইমার কোচ হতে চায়? কিংবা পার্টটাইমার কোচ হওয়ার ইচ্ছে? এসব ভেঙে বলতে হবে। সব কিছুর তো নিয়ম কানুন আছে। তা মেনেই কাজ করতে হবে।’

‘দিনশেষে চরম সত্য হলো, মোহাম্মদ রফিক অনেক বড় খেলোয়াড়। কিন্তু কোচিংয়ে আসলে কোচ রফিক হিসেবে কাজ করতে হবে। বিসিবির কোচ নিয়োগ ও পরিচালনারও একটি নির্দিষ্ট মানদন্ড আছে। তা মেনে ছক অনুযায়ীই কাজ করতে হবে। রফিক অনেক বড় স্টার, অনেক বড় নাম। তাই বলে তো আর তাকে সরাসরি জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব দিয়ে দেয়া যায় না। জাতীয় দলের কোচিং স্টাফ নিয়োগেরও একটি মানদন্ড সেট করা আছে। আমি তাকে জাতীয় দলের কোচিং প্যানেলে ঢুকাতে পারব না।’

‘তারপরও আমি গেম ডেভলপমেন্ট প্রধান হয়ে দুর্জয়ের সঙ্গে কথা বলে হাই পারফরমেন্স ইউনিটের কোচিং স্টাফ হিসেবে তার জন্য কথা বলতে পারি। কিন্তু তারও একটি ছক আছে, নিয়মকানুন আছে। এখন রফিক সেই নিয়ম মেনে কাজ করতে চাইলেই হবে।’