শিক্ষার মান কমছে বিশ্বভারতীর

পশ্চিমবঙ্গের বিপুল সংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থান খুঁজে নিতে অন্য রাজ্যে যান৷ দিল্লি, মুম্বাই থেকে গুজরাত কিংবা কেরালা, তামিলনাড়ুতে ছড়িয়ে পড়েছেন তাঁরা৷ বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে ছোটখাটো কাজে ভিনরাজ্যে নিজেদের কর্মসংস্থান খুঁজে নিয়েছেন বাঙালিরা৷ একইভাবে অন্য রাজ্যের মানুষ পশ্চিমবঙ্গে এসে জীবিকা নির্বাহ করছেন৷

পশ্চিমবঙ্গে শিল্পের বিকাশ মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের মতো না হওয়ায় পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি হয়নি, এমনটা অনেকের মত৷ মেধা বা জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে কিন্তু বাংলার শিক্ষা মহলের স্থান সর্বভারতীয় স্তরে বেশ মর্যাদার, এমনটাই মনে করা হয়৷ যদিও এই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে এই কেন্দ্রীয় সমীক্ষা৷

মানের বিচারে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান কোথায়, তার ব়্যাংকিং তৈরি করে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ব়্যাংকিং ফ্রেমওয়ার্ক (এনআইআরএফ)৷ বিভিন্ন মাপকাঠিতে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বিচার করা হয়৷ এর মধ্যে একটি, সাধারণ মানুষ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করেন৷

অনেক সময় ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় উঠে আসে, এই প্রতিষ্ঠান ভালো বা ওই প্রতিষ্ঠান তত ভালো নয়৷ এই মনোভাবকে একটা মাপকাঠিতে ফেলে ব়্যাংকিংয়ের চেহারা দিয়েছে এনআইআরএফ৷ এটাকে বলা হচ্ছে ‘পারসেপশন’ অর্থাৎ জনমানসে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি কেমন, তার প্রতিফলন ঘটেছে ব়্যাংকিংয়ে৷

এই সমীক্ষায় কলকাতার বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আইআইটি খড়গপুর, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানজনক জায়গায় রয়েছে৷ কিন্তু, পশ্চিমবঙ্গের অনেক প্রতিষ্ঠান ন্যূনতম নম্বর পায়নি৷ এর মধ্যে রয়েছে কবিগুরুর বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, যা এই ব়্যাংকিং অনুযায়ী সাধারণ মানুষের চোখে শিক্ষালাভের উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান নয় বলে চিহ্নিত হয়েছে৷

পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুর এনআইটি এই মাপকাঠিতে একশোর মধ্যে পেয়েছে ৯.১৫৷ শিবপুরের আইআইইএসটি বা পূর্বতন বেসু আগের থেকে উন্নতি করলেও এখনো ভালো জায়গায় নেই৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশ্বভারতী, যেখানে আজও আশ্রমিক বিদ্যালয় চলে, প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ের বাইরে জ্ঞান অর্জনের জন্য পাঠদান করা হয়, সেই প্রতিষ্ঠান পেয়েছে মাত্র ১০.৪২ নম্বর৷

অপেক্ষাকৃত ভালো জায়গায় রয়েছে বর্ধমান ও কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়৷ তাদের প্রাপ্ত নম্বর ১৯-এর বেশি৷ এই তালিকায় ভালো স্থানে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠান আইআইটি খড়গপুর (৮২.২১), যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (৫৯), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (৪২.৮৪)৷

বিশ্বভারতী এই ব়্যাংকিংয়ে এত নীচে কেন? অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীকে বিজ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু, সেটা নাচ-গান শেখার কেন্দ্র হয়ে রয়ে গিয়েছে৷ শান্তিনিকেতন বলতে হয়ে দাঁড়িয়েছে পঁচিশে বৈশাখ, বাইশে শ্রাবণ ও অন্যান্য সমারোহ৷ বিশ্বভারতী তার বিদ্যাচর্চার আধুনিকীকরণ করেনি, তাই পিছিয়ে গিয়েছে৷’

তাঁর মতে, বাঙালি রবীন্দ্রনাথকে যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারেনি৷ বলেন, ‘বাঙালির রবীন্দ্র-ব্যাখ্যায় গলদ রয়েছে৷ তিনি শুধু নৃত্যনাট্য-গীতিনাট্যের রচয়িতা ছিলেন না, ছিলেন এক সর্বত্রগামী বুদ্ধিজীবী৷ এখানে বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃত যতটা গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়, পদার্থবিদ্যা, রসায়নও পড়ানো উচিত৷’

ঔপনিবেশিক আমলে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার মান যে জায়গায় ছিল, এখন তা নেই৷ একথা মেনে নিচ্ছেন বাংলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকরা৷ এই পরিস্থিতিতেও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকার প্রশংসা করেন বিশ্বভারতীর শিক্ষক বিশ্বজিৎ রায়৷ তিনি প্রশ্ন তোলেন জাতীয় শিক্ষানীতি নিয়ে৷

তিনি বলেন, ‘শিক্ষাক্ষেত্র অধিকাংশ ক্ষেত্রে জীবিকামুখী হয়ে উঠেছে৷ এটা কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতির ত্রুটি, একটা সময় বুঝতে পারা যাবে৷ এতে গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতি ঘটছে৷ একজন গণিতজ্ঞের তুলনায় প্রযুক্তিবিদের গুরুত্ব বেশি চাকরির কারণে৷ এখনকার ছেলেমেয়ো কতটা পড়তে চায়, কতটা চাকরির জন্য শিখতে চায়, এই ভেদটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে৷ গোটা দেশ হোয়াইট কলার লেবার উৎপাদনের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে৷’