শিক্ষার জন্য লেখালেখির কিছু কৌশল

বেশ কয়েক বছর আগের কথা, বাংলাদেশের ভূমিকম্প নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে এ অঞ্চলে অতীতের ভূমিকম্পগুলোর ইতিহাস জানার প্রয়োজন হলো, কাগজপত্র ঘেঁটে ১৫৪৮ সালের আগের কোনো তথ্যাদি পাওয়া গেল না। সমস্যা নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে বিদেশি এক ভূবিজ্ঞানী তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে পরামর্শ দিলেন ইতিহাস, পুরোনো সাহিত্য যেমন সংস্কৃত বা পালি ভাষার সাহিত্য দেখার, সেখানে বিশদ বিবরণ না পেলেও তথ্যাকারে কিছু পাওয়া যেতে পারে।

উল্লেখ্য, গ্রিস বা চীনের ভূমিকম্পের কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস জানা আছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত অনেক প্রশাসনিক, পরিসংখ্যান প্রতিবেদন এমনকি ভ্রমণ প্রতিবেদনগুলো দলিল হয়ে আছে, যা এখনো গবেষণায় কাজে লাগে। ওপরের দৃষ্টান্তগুলোয় দেখা যায় যে সাহিত্য বা ইতিহাস এমনকি অন্যান্য লেখার উপাদানও কীভাবে সংশ্লিষ্ট গবেষণা ছাড়াও বিজ্ঞান গবেষণায় সহায়ক হতে পারে। কাজেই কোথাও না কোথাও লিখিত আকারে থাকলে তার প্রয়োজন হয়, ব্যবহার হয়। এ জন্যই লেখালেখিটা বর্তমানে যেমন দরকারি, ভবিষ্যতেও তেমনি। প্রসঙ্গক্রমে আরও একটা উদাহরণ দেওয়া যায়—বৈশ্বিক কোভিড-১৯ অতিমারি আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলেছে, এসব নিয়ে আলোচনা, গবেষণা, বিশ্লেষণ করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা পণ্ডিতেরা; ভবিষ্যতেও করবেন এবং বিস্তর লিখছেন তো বটেই। তবে যাঁরা অতি সাধারণ, তাঁদের পর্যবেক্ষণ, অনুভূতি, উপলব্ধিগুলোও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ, ভবিষ্যতে দরকার হতে পারে—এসবের প্রকাশ ও সংরক্ষণের মাধ্যম হলো লেখালেখি।

মোটা দাগে লেখালেখি মূলত দুই ধরনের—একাডেমিক বা গবেষণাধর্মী ও সৃজনশীল। প্রথমটি কলা, বিজ্ঞান, দর্শন ইত্যাদি অসংখ্য শাখা রয়েছে, যা অভিসন্দর্ভ, সাময়িকী, জ্ঞানকোষের মাধ্যমে লেখা হয়। প্রতিটি লেখা বা উপস্থাপনার সাধারণভাবে স্বীকৃত রীতি বা নির্দেশনাবলি আছে। তবে সৃজনশীল লেখার রীতি থাকলেও লেখকের নিজস্ব ভঙ্গি থাকাটাই স্বাভাবিক—নিজস্ব শৈলী তৈরি ও মেনে চলার স্বাধীনতা তাঁর আছে। এ ক্ষেত্রে সাধারণ কতগুলো প্রসঙ্গ বিবেচনায় রাখতে হয়—প্রথমে লেখককে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে এবং নিজের কাছে উপভোগ্য মনে হয়, এমন আলোচ্য বিষয় বেছে নিতে হবে। এরপরে আসে পাঠকের বিষয়টি—তারা কারা, তাদের আগ্রহ কিসে ও আগ্রহকে ধরে রাখা কলাকৌশল। পরবর্তী সময়ে বিবেচ্য হলো ভাষারীতি নির্বাচন। শুরুতে রচনার একটা কাঠামো ঠিক করতে হয়, যা লেখার গতিপথ ঠিক রাখায় সহায়ক হয়। বিভিন্ন পড়াশোনা থেকে ভালো ভালো ধারণাগুলো গ্রহণ, সে সময় অর্থবোধক যদি না–ও হয়, টোকা বা লিখে রাখার অভ্যাস করা। এগুলোর প্রতিটা চর্চার ব্যাপার এবং ধীরে ধীরে রপ্ত করার ব্যাপার। পর্বের শেষ কথা হলো ভালো রচনার জন্য ভালো লেখক হতে হবে না, তবে মনোযোগী বা সতর্ক লেখক হতে হবে।

আরও কিছু প্রয়োজনীয় কথা। যেমন কাদের জন্য লেখা, সহজ ও সংক্ষিপ্ত উত্তর—সবার জন্য। গভীর গবেষণালব্ধ ফলাফল সিরিয়াস গবেষক ও একাডেমিকদের জন্য, নতুন চিন্তা বা ভবিষ্যতে কাজে লাগবে, এমন কিছু ভাবনা তরুণ শিক্ষার্থীদের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য, দেশ ও জাতির কল্যাণার্থে যা প্রয়োজনীয়, তা নীতিনির্ধারকদের জন্য, সচেতনতা বাড়াতে সবার জন্য লেখা। তাহলে লেখা কি যা ইচ্ছা তাই লেখা, এবারও সহজ ও সরল উত্তর—না। প্রথমে ভাবতে হবে, যা লিখতে চাচ্ছি আসলেই তাতে বলবার মতো কিছু আছে কি। একই কথা বারবার লিখছি কি—তবে কখনো কখনো একই কথা বারবার বিভিন্ন জায়গায় বলতে হয়, সচেতনতা বাড়াতে।

কাজেই দেশের মানুষের কল্যাণে, দেশের কল্যাণে, মানবসভ্যতার কল্যাণে লিখতে হবে, লিখে যেতে হবে—আমার আবেদনটা বিশেষত তরুণ প্রজন্মের কাছে, প্রত্যাশাও তাদের কাছে। লেখালেখি তাদের আত্মবিশ্বাস আরও দৃঢ় ও দক্ষতা বৃদ্ধি করবে, সর্বোপরি সৃষ্টির অপার আনন্দ। ভূতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণে বাংলাদেশ পৃথিবীতে অনন্য—তিনটি বড় নদীবাহিত পলি দিয়ে বিশ্বের অন্যতম বড় এ বদ্বীপের অবস্থান সক্রিয় ভূগাঠনিক অঞ্চলে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত বিপুল জনগোষ্ঠী। এ মানুষদের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, পরিবেশ ও দুর্যোগ, সমাজ, অর্থনীতি, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব, বিজ্ঞান, ভূপ্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ তথা সমস্যা ও সম্ভাবনা ইত্যাদি নানা বিষয়ে লেখার অফুরন্ত সুযোগ আছে—শুধু চোখ-কান খোলা রাখলেই হবে, সঙ্গে পড়াশোনার অভ্যাসটাও জরুরি, যা লেখালেখির জন্য সহায়ক।

* লেখক: ড. এ কে এম খোরশেদ আলম; ভূতত্ত্ববিদ গবেষক