শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার দাবি জোরালো হচ্ছে

প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। করোনার কারণে গত বছরের ১৮ মার্চ থেকে প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাধারণ ছুটি আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত নতুন করে বাড়ানো হয়েছে। এ নিয়ে মোট ২২ দফা বাড়ানো হলো ছুটি। ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা বন্ধ দাঁড়াচ্ছে ৫৩৩ দিনে।

এদিকে, বন্ধ থাকা এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবে খুলে দেওয়া হবে তা নিয়ে স্পষ্ট করে কিছু বলেনি সরকার। তবে সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি জানিয়েছেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে কিনা বিষয়টি করোনা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

শিক্ষার্থীরা এটা মানতে নারাজ। তাদের কথা, বাংলাদেশে সবকিছু আগের নিয়মে চলছে। সেখানে কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। তাছাড়া সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানই খোলা রয়েছে। শুধু শিক্ষার্থী নয়, শিক্ষকদের বিভিন্ন সংগঠন, রাজনৈতিক সংগঠন ও তাদের ছাত্রসংগঠনসমূহ এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও’র পক্ষ থেকেও স্বল্প সময়ের মধ্যে কোভিড-১৯ এর টিকা প্রদান করে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে অতিদ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ খোলার জোরালো দাবি জানিয়েছেন।

তথ্যমতে, অন্য সব স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আগে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিতে চায় সরকার। এরই অংশ হিসেবে চলতি মাসের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিকাদানও শেষ করতে চায়। বিশেষ করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আবাসিক শিক্ষার্থীদের দুই ডোজ টিকাদান শেষ হলেই সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে দেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলছেন, এবার তারা সেপ্টেম্বর নাগাদ সীমিত পরিসরে হলেও বিশ্ববিদ্যালয় খোলার উদ্যোগ নিতে চান। সম্প্রতি তিনি গণমাধ্যমের এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমরা আশা করছি আমাদের ছাত্র-ছাত্রী যে জনসংখ্যা আছে, সেটা খুব শিগগির সেটার বেশিরভাগ ভ্যাকসিনেটেড হয়ে যাবে সেপ্টেম্বরের মধ্যে। প্রাথমিক পর্যায়ে ভ্যাক্সিনেশন প্রোগ্রাম চলবে এবং আমরা আশা করছি সংক্রমণ যদি কিছুটা কমে আসে আমরা শারীরিক উপস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কিয়দংশ খুলতে পারবো বলে আশা করছি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের টিকাদান শেষ করা হবে। এছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও টিকাদান দ্রুত শেষ করা হবে। শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ক্লাস কার্যক্রম সশরীরে শুরু করতে চায় মন্ত্রণালয়। এরপর কলেজ এবং সবশেষ মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলার পরিকল্পনা করেছে সরকার।

তবে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪২ লাখ। এর মধ্যে ৩৯ লাখই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের শিক্ষার্থী, যাদের বেশির ভাগেরই আবাসিক হলে থাকার সুযোগ নেই। আবার সরকারি কলেজের আবাসিক হলগুলোতেও কত শিক্ষার্থী আছে তার সঠিক হিসাব নেই। ফলে মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চশিক্ষার সব শিক্ষার্থীকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

ইউজিসি বলছে, শিক্ষার্থীদের করোনা টিকা দেয়া শেষ হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল-ক্যাম্পাস খোলা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ইউজিসির কোনো আপত্তি থাকবে না। তবে টিকা না দেয়া গেলে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার জন্য সংক্রমণ কমার অপেক্ষা করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে ইউজিসি সদস্য প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, আগস্ট মাসের মধ্যে যদি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের করোনার টিকা কার্যক্রম শেষ হয়ে যায় তাহলে আগস্টে হল-ক্যাম্পাস খোলা যাবে। তবে এই সময়ের মধ্যে সব শিক্ষার্থীকে টিকা দেয়া নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, এই মুহূর্তে জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া টিকা দেয়া হচ্ছে না। এতে করে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এখনো টিকার নিবন্ধন করতে পারেনি। আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে বিকল্প উপায়ে শিক্ষার্থীদের টিকা দেয়ার অনুরোধ করলেও এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

তথ্য অনুযায়ী, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ। এর মধ্যে আবাসিক হলে থাকেন ১ লাখ ৩০ হাজার। তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থীদের টিকা দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পক্ষে মত দিয়েছেন কোভিড-সংক্রান্ত জাতীয় পরামর্শক কমিটির সদস্যরাও।

অবিলম্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা না হলে রাজপথে ক্লাসরুম হবে

সকলের জন্য করোনার টিকা নিশ্চিত কর, টিকা নিয়ে দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনা বন্ধ করা, অবিলম্বে সকল শিক্ষার্থী-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টিকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পরিকল্পনা ঘোষণা করা সহ ৪ দফা দাবিতে সমাবেশ করেছে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট। আজ শুক্রবার (১৩ আগস্ট) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পরিকল্পনা প্রকাশের দাবি জানিয়ে সংগঠনের সভাপতি আল কাদেরী জয় বলেন, সরকারের লকডাউন ঘোষণাও অপরিকল্পিত ভাবে হয়, আবার অপরিকল্পিতভাবেই সরকার লকডাউন তুলে দেয়। এই চূড়ান্ত সমন্বয়হীতায় আজ দেশের আপামর ছাত্র-জনতার জীবন অনিশ্চয়তার মুখে। ইতমধ্যেই কত শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। অনেকেই জীবিকার তাগিদে পড়াশোনা ছেড়ে কাজের খোজে বের হতে বাধ্য হয়েছেন। সেখানে গিয়েও হাশেম ফুড কোম্পানির অগ্নিকান্ডের ঘটনার মত কোন এক ঘটনায় হয়ত জীবন হারিয়েছেন। এভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে শিক্ষার্থীরা চুপ করে বসে থাকবে না। অবিলম্বে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পরিকল্পনা হাজির না করলে আমরা রাজপথেই হবে ক্লাসরুম।

সমাবেশ থেকে ৪ দফা দাবি জানানো হয়-

১। করোনা মোকাবেলায় সরকারের ব্যর্থতা-দুর্নীতি আড়াল করার চক্রান্ত রুখে দাড়াও।

২। সকলের জন্য করোনার টিকা নিশ্চিত কর, টিকা নিয়ে দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনা বন্ধ কর।

৩। অবিলম্বে সকল শিক্ষার্থী-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টিকা দাও, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পরিকল্পনা ঘোষণা কর।

৪। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের করোনাকালের বেতন-ফি মওকুফ কর।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দ্রুত খুলে দেওয়াসহ ৯ সুপারিশ টিআইবির

করোনা মহামারিতে দীর্ঘদিন সশরীরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম থেকে দূরে থাকা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জে দেশের তরুণ সমাজ মানসিক ও আর্থসামাজিকভাবে সংকটময় সময় পার করছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় যুব জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিশ্চিতে দ্রুত ও কার্যকর মনোযোগ এবং বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। মহামারিকালে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ৯টি সুপারিশ করে সংস্থাটি।

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক যুব দিবস উপলক্ষে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দেশে করোনার কারণে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার ১৬ মাস পার হলেও সেগুলো খোলার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সমন্বিত ও কার্যকর কোনো কর্মপরিকল্পনা নেওয়া যায়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইনে ক্লাসের চেষ্টা করা হলেও কারিগরি দক্ষতা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগের অভাবে তা অনেকাংশেই সফল হয়নি। বরং এটি শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন এক বৈষম্যের মুখোমুখি করেছে। বেশকিছু গবেষণা বলছে, গ্রামাঞ্চলের ৬৩ শতাংশ পরিবারের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই এবং ব্যবহারের দক্ষতা নেই ৮৭ শতাংশের। ফলে গ্রামীণ ও আদিবাসী শিক্ষার্থীরা বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। এতে ধনী-গরিব ও শহর-গ্রামের মধ্যে শিক্ষা পাওয়ার সুযোগের ক্ষেত্রে বৈষম্য প্রকট হয়েছে; যা মোকাবিলায় কার্যকর কোনো সরকারি উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়। এটি সত্যিই হতাশার।

দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এবং মহামারির প্রভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত পরিবারগুলোর আয় কমে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণার তথ্যানুযায়ী মহামারির থাবায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে যথাক্রমে ১৯ ও ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পড়াশোনার বাইরে চলে গেছে। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশঙ্কায় বাল্যবিয়ে বেড়ে গেছে আশঙ্কাজনক হারে (২৬%)। বিপুলসংখ্যক এই শিক্ষার্থীকে কীভাবে আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনা হবে? আদৌ ফিরিয়ে আনা যাবে কিনা? সেটি নিয়েও কারও মাথাব্যথা আছে বলে মনে হচ্ছে না। শিক্ষা খাতের নতুন এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন করে যে বাড়তি বিনিয়োগ বা সহায়তা প্রয়োজন তার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে কোনো বরাদ্দ এখনও দৃশ্যমান নয়, যাকে অপরিণামদর্শী বলাটা মোটেও বাহুল্য হবে না।

মহামারিতে যুব বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা সত্যি হতে চলেছে উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, মহামারির প্রভাবে গত বছরই যুব বেকারত্বের হার দ্বিগুণ হওয়ার যে আশঙ্কা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা করেছিল, এতদিনে তা আরও বেড়েছে এটি অনায়াসে বলা যায়। মহামারিতে কাজ হারানো মানুষের বড় অংশই তরুণ ও যুবক; এদের বেশিরভাগই আবার অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মী- যাদের জন্য সরকারি উদ্যোগে পরিকল্পিত বড় ধরনের কোনো সহায়তা এখনও অনুপস্থিত। শুধু চাকরি হারানোই নয়, মহামারি চাকরি বাজারে নতুন ধরনের পরিবর্তনও নিয়ে এসেছে, যেখানে খাপ খাওয়াতে প্রযুক্তিগত ও কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন বেড়েছে ব্যাপকভাবে।

মহামারির এই সময়ে তরুণদের শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র ও স্বাধীন মত প্রকাশ নিশ্চিত করতে টিআইবির সুপারিশগুলো হচ্ছে- ১. শিক্ষার্থীসহ সংশ্নিষ্ট সবাইকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্বল্প সময়ের মধ্যে করোনার টিকা দিয়ে যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে অতি দ্রুত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দিতে হবে; ২. স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে সব পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন কার্যক্রম নিশ্চিত করে পরবর্তী স্তরে উত্তরণের ব্যবস্থা নিতে হবে; ৩. ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে নারী, প্রতিবন্ধী, আর্থিকভাবে অসচ্ছল, আদিবাসী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনার মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষাগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে; ৪. স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে তরুণদের যথাযথ কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে; ৫. তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনার পাশাপাশি করোনায় যেসব ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত থেকে তরুণরা কর্মহীন হয়েছে বিশেষ প্রণোদনার মাধ্যমে সেগুলো চালুর উদ্যোগ নিতে হবে; ৬. কারিগরি ও বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিকল্প পেশার (যেমন আউটসোর্সিং, ফ্রিল্যান্সিং) জন্য কর্মহীন তরুণ বা নতুন গ্র্যাজুয়েটদের প্রস্তুত করতে হবে; ৭. সরকারি-বেসরকারি যেসব চাকরির পরীক্ষা ও নিয়োগ বন্ধ রয়েছে, অবিলম্বে সেগুলোর প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে এবং নতুন বিজ্ঞপ্তির ক্ষেত্রে মহামারির প্রেক্ষাপট বিবেচনায় যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে; ৮. সব চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া দুর্নীতিমুক্ত রেখে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে সমান প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং ৯. তরুণ সমাজসহ সব নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আইনি ও নীতিকাঠামোর প্রয়োজনীয় আমূল সংস্কার করারও দাবি জানিয়েছে টিআইবি।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি বাশিসের

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বাশিস) এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরাম। বৃহস্পতিবার (১২ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই দাবি জানানো হয়।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির (বাশিস) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ লিয়াজোঁ ফোরামের মুখপাত্র মো. নজরুল ইসলাম রনি এবং বাশিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মোহাম্মদ আতিকুর রহমান তালুকদার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার দাবিতে এই বিবৃতি দেন।

বাশিস নেতারা বলেন, দীর্ঘ ১৭ মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ছাত্র-ছাত্রীরা বইয়ের জগত ছেড়ে ফেসবুক বা পাবজি গেমে কিংবা নেশার জগতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এতে মানসিক সমস্যায় ভুগছে শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট আদান-প্রদান চলছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা অ্যাসাইনমেন্ট ভালোভাবে বুঝতে পারছে না অনেকেই। তাই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় বা সপ্তাহে কমপক্ষে তিন দিনের জন্য হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলে শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্ট বুঝতে সুবিধা হবে। পর্যায়ক্রমে পরিস্থিতি বুঝে অন্যান্য শ্রেণির ক্লাস চালু করা যেতে পারে বলে উল্লেখ করেন এই শিক্ষক নেতারা।

বিবৃতিতে শিক্ষক নেতারা আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অভিভাবক, ছাত্র ও শিক্ষক সবাই উদ্বিগ্ন। এমনকি অভিভাবকদের স্টেশনারি ও লাইব্রেরিসহ অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এতে অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যারাও চরম অর্থ সংকটে আছেন। অভিভাবকরাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাসিক টিউশন ফি পরিশোধ করতে পারছেন না। এতে শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠানের বেতনের অংশ না পেয়ে চরম অর্থ সংকটে দিন যাপন করছেন।

সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিন: খেলাফত মজলিস

যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করে কওমী মাদ্রাসাসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসাইন। এছাড়া গণটিকা দান কর্মসূচির ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা ও বিশৃঙ্খলা বন্ধ করারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

মঙ্গলবার (১০ আগস্ট) দুপুরে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান মজলিসের দুই নেতা।

বিবৃতিতে বলা হয়, করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘ দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে প্রায় সকল ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ক্যাম্পাস দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে একদিকে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা বিঘ্নিত হচ্ছে অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা নেমে এসেছে। বহু শিক্ষার্থী ঝড়ে পরার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

অবিলম্বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিন: মির্জা ফখরুল

অবিলম্বে জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠনসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, করোনা শিক্ষাক্ষেত্রে, অর্থনীতিতে, রাজনীতিতে ও আমাদের ভবিষ্যৎকে একেবারে প্রভাবিত করছে। মারাত্মকভাবে ক্ষতিও হয়েছে। এ জন্য শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে অবিলম্বে জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া প্রয়োজন। শিফট করে, বিভিন্ন রকম কারিকুলাম প্রণয়ন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করতে হবে।

সম্প্রতি বিএনপির উদ্যোগে ‘কোভিড-১৯ বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থা-সরকারের সিদ্ধান্তহীনতায় মহাসংকটে জাতির ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আজ অসংখ্য শিক্ষক বেকার হয়ে গেছেন, কর্মহীন হয়ে গেছেন। সরকার সম্পূর্ণভাবে তাদের অবহেলা করেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সবাইকে সরকার পরিবর্তনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করতে আর অপেক্ষা নয়: ইউনিসেফ-ইউনেস্কো

কোভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর ১৮ মাস পেরিয়ে গেছে এবং লাখ লাখ শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে জানিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু করার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ-ইউনেস্কো।

গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর ও ইউনেস্কোর মহাপরিচালক অড্রে অ্যাজুল এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘আজ পর্যন্ত বিশ্বের ১৯টি দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ১৫ কোটি ৬০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটা চলতে পারে না। বন্ধের ক্ষেত্রে স্কুলগুলো সবার শেষে এবং পুনরায় খোলার ক্ষেত্রে সবার আগে থাকা উচিত।’

এতে বলা হয়, ‘সংক্রমণ সীমিত পর্যায়ে রাখার প্রচেষ্টায় সরকারগুলো অনেক সময়ই স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে এবং দীর্ঘকাল ধরে সেগুলো বন্ধ রেখেছে, এমনকি মহামারিজনিত পরিস্থিতি যখন এটা দাবি করে না তখনো। প্রায়শই এই ব্যবস্থাগুলো শেষ পদক্ষেপ হিসেবে নেওয়ার বদলে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্কুলগুলো বন্ধ রাখা হলেও বার ও রেস্তোরাঁগুলো খোলা ছিল।’

‘স্কুলে যেতে না পারার কারণে শিশু এবং তরুণ জনগোষ্ঠী যে ক্ষতির সম্মুখীন হবে তা হয়তো কখনোই পুষিয়ে নেওয়া যাবে না। শেখার ক্ষতি, মানসিক সংকট, সহিংসতা ও নির্যাতনের সম্মুখীন হওয়া থেকে শুরু করে স্কুল-ভিত্তিক খাবার ও টিকা না পাওয়া বা সামাজিক দক্ষতার বিকাশ কমে যাওয়া- শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি তাদের শিক্ষাগত অর্জন এবং সামাজিক সম্পৃক্ততায় এর প্রভাব পরিলক্ষিত হবে।’

২২ দফায় বেড়েছে ছুটি, বন্ধ থাকবে টানা ৫৩৩ দিন

গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ২২ দফা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ানো হয়েছে। প্রথমে গত ১৬ মার্চ সংবাদ সম্মেলন ডেকে শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন। প্রথমে ৩১ মার্চ পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরে প্রথমে ৪ এপ্রিল এবং পরে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এই ছুটি চতুর্থ দফায় বাড়ানো হয় ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত। এরপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে রোজার ছুটি শুরু হয়ে যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তা ছিল ১৫ জুন পর্যন্ত।

এরপর একসঙ্গে পৌনে ২ মাস বাড়িয়ে ৬ আগস্ট পর্যন্ত ছুটি ঘোষণা করা হয়। পরের দফায় ওই ছুটি ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ে। এরপর এক মাস বাড়িয়ে ছুটি করা হয় ৩ অক্টোবর পর্যন্ত। সেই ছুটি শেষ হওয়ার আগেই ১ অক্টোবর বলা হয়, করোনা সংক্রমণের পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হলো।

২৯ অক্টোবর পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সাধারণ ছুটি ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সেই ছুটি শেষ না হতেই ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছুটি বাড়ানো হয়। এরপর ঘোষণা দিয়ে প্রথমে ১৬ জানুয়ারি ও পরে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বাড়ে ছুটি। পরে ১৪ ও ২৮ ফেব্রুয়ারি দুই দফায় ছুটি বাড়ে।

এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে বৈঠক করে শিক্ষাসহ সরকারের ৬টি মন্ত্রণালয়। পরিস্থিতি পর্যালোচনা শেষে সেদিন ঘোষণা করা হয়, ৩০ মার্চ স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা খুলে দেওয়া হবে। আর এর আগের ঘোষণা অনুযায়ী ২৪ মে বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হবে। আর শিক্ষার্থীদের ১৭ মে হলে তোলা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় পরে খোলার কারণ হিসাবে বলা হয়েছিল, আবাসিক হলে অবস্থান নির্বিঘ্ন করতে ওই সময়ের মধ্যে ১ লাখ ৩১ হাজার ছাত্রছাত্রীকে টিকা দেওয়ার কাজ শেষ করা হবে।

কিন্তু শহরের পাশাপাশি মফস্বল অঞ্চলেও করোনার ডেল্টা ধরনের সংক্রমণে তা আর হয়ে উঠেনি। এ অবস্থায় ২৯ মে বন্ধ রাখার কথা বলা হয়। সেই ছুটি শেষ না হতেই গত ২৬ মে সংবাদ সম্মেলনে ১৩ জুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেন শিক্ষামন্ত্রী।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাও প্রথমে ৩০ জুন ও পরে ৩১ জুলাই পর্যন্ত বাড়ানো হয়। আর সর্বশেষ ২৯ জুলাই রাত ১১টায় পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৩১ আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি থাকবে।