রক্তাক্ত ১৫ আগস্ট স্মরণ করব, শক্তিও নেব

শোকের পাশাপাশি দেশকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং কাজগুলো সমাপ্ত করার সংকল্প গ্রহণ করতে হবে।

প্রতিবছর বিষাদে মোড়া ১৫ আগস্ট আসে, ইতিহাসের এই কালো দিনে আমরা আরেকবার ফিরে যাই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, তাঁর পরিবারের যাঁরা সেদিন একদল ঘাতকের জিঘাংসার শিকার হয়েছিলেন, তাঁদের স্মরণ করি। শোকের পাশাপাশি আমরা দেশকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং কাজগুলো সমাপ্ত করার সংকল্প গ্রহণ করি।

সেই কাজে নামাটা যে সবার জন্যই জরুরি, সেই বোধটা আমাদের মধ্যে সব সময় কাজ করে না। কতভাবে, কী পরিকল্পনায়, কী রকম দক্ষতায়, কতটা সময়ে একটা কাজ শেষ করে আরেকটা কাজ হাতে নিতে হবে, তারও কোনো ধারণা সবাই করতে পারে না এবং কাজগুলো যেহেতু দেশের জন্য, দশের জন্য, এর যে কোনো বিরাম নেই, বরং প্রতিদিন নতুন নতুন মাত্রা যে এগুলোয় যুক্ত হয় নতুন নতুন দক্ষতা তৈরির অনিবার্য ঘোষণা দিয়ে, এ বিষয়ও সবার চিন্তায় আসে না। ফলে কাজ যা হয়, বিক্ষিপ্তভাবে হয়; পরিকল্পনা যা বলে, তা মেনে হয় না। এতে দিন শেষে একটা ফল পাওয়া যায় বটে, কিন্তু তা সব মানুষের পক্ষে যায় না। যদি যেত, গরিব মানুষের ভাগ্য বদলে যেত।

প্রতিবছর বিষাদে মোড়া ১৫ আগস্ট আসে, ইতিহাসের এই কালো দিনে আমরা আরেকবার ফিরে যাই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, তাঁর পরিবারের যাঁরা সেদিন একদল ঘাতকের জিঘাংসার শিকার হয়েছিলেন, তাঁদের স্মরণ করি। শোকের পাশাপাশি আমরা দেশকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্ন এবং কাজগুলো সমাপ্ত করার সংকল্প গ্রহণ করি।

সেই কাজে নামাটা যে সবার জন্যই জরুরি, সেই বোধটা আমাদের মধ্যে সব সময় কাজ করে না। কতভাবে, কী পরিকল্পনায়, কী রকম দক্ষতায়, কতটা সময়ে একটা কাজ শেষ করে আরেকটা কাজ হাতে নিতে হবে, তারও কোনো ধারণা সবাই করতে পারে না এবং কাজগুলো যেহেতু দেশের জন্য, দশের জন্য, এর যে কোনো বিরাম নেই, বরং প্রতিদিন নতুন নতুন মাত্রা যে এগুলোয় যুক্ত হয় নতুন নতুন দক্ষতা তৈরির অনিবার্য ঘোষণা দিয়ে, এ বিষয়ও সবার চিন্তায় আসে না। ফলে কাজ যা হয়, বিক্ষিপ্তভাবে হয়; পরিকল্পনা যা বলে, তা মেনে হয় না। এতে দিন শেষে একটা ফল পাওয়া যায় বটে, কিন্তু তা সব মানুষের পক্ষে যায় না। যদি যেত, গরিব মানুষের ভাগ্য বদলে যেত।

কাজগুলো কী কী, তা নিয়ে এখন কিছু বলে নেওয়া যায়। কোভিড মহামারি আমাদের নিঃস্ব করেছে। প্রচুর পরিবারে নেমে এসেছে শূন্যতা। অসংখ্য পরিবার উপার্জন হারিয়ে বিপন্ন হয়েছে, দারিদ্র্য বেড়েছে, রুগ্‌ণতা এবং অপুষ্টিও। প্রায় দেড় বছর শিক্ষাবঞ্চিত বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থী। কর্মহীনতা, চাকরি হারানোর শঙ্কা তরুণদের বিপর্যস্ত করছে। আমাদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বাস্থ্যসেবাকে জনবান্ধব করা, কর্মসংস্থান বাড়ানো, শিক্ষাকে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা, একে আরও গতিশীল এবং ভবিষ্যন্মুখী করে সবার তাতে অংশগ্রহণের পথটা সুগম করে দেওয়া। এই মহামারির সময় আমাদের সমাজজীবনের পুরোনো কিছু অপচর্চায় নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে, নীতিহীনতার ব্যাপ্তি বেড়েছে। সারা বিশ্বে যখন অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি হোঁচট খেয়েছে, আমাদের দেশে পশ্চিমা মাপের বিত্তশালীদের সংখ্যায় রেকর্ড বৃদ্ধি ঘটেছে। এঁদের অনেকেই বাঁকাচোরা পথে এত বিপুল বিত্তের মালিক হয়েছেন। তবে আর্থিক দুর্নীতির খবর এমনই ডালভাত হয়ে গেছে আমাদের জন্য যে অঙ্কের হিসাবে তা হাজার কোটির ধারেকাছে না হলে তা শুনতে আগ্রহ থাকে না। বঙ্গবন্ধুর এই বাংলাদেশেই ক্ষমতার জোরে বড় বড় দুর্নীতিবাজ, ব্যাংক লোপাট ও বিদেশে টাকা পাচারকারী পার পেয়ে যায়, এটি ভাবতেও অবাক লাগে।

আমাদের আরও একটি বড় কাজ হচ্ছে দুর্নীতির মূল ধরে টান দেওয়া, আইনের শাসন আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। এগুলো বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন। তাঁর চিন্তায় সমাজতন্ত্র ছিল রাষ্ট্রের সম্পদে সবার অধিকার নিশ্চিত করা, গণতন্ত্র ছিল ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনা ও ক্ষমতাকে তৃণমূলের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া এবং শিক্ষাচিত্র ছিল প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সক্ষমতা আর প্রতিভার সর্বোচ্চ বিকাশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাদের সৃজনশীল ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষায় শিক্ষিত করা। তিনি স্বাধীনতার এক বছরের মধ্যে একটি সংবিধান আমাদের দিয়েছিলেন, তিন বছরের মধ্যে একটি শিক্ষা পরিকল্পনাও দিয়েছিলেন, যা এক বিজ্ঞানীর নেতৃত্বে তৈরি হয়েছিল এবং যাতে ওই অর্থনৈতিক দুর্যোগের সময়েও শিক্ষা খাতে জাতীয় উৎপাদনের ৪ থেকে ৭ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর যে তিনটি বই এখন সহজলভ্য, সেগুলোতে তিনি গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি ও ক্ষমতার জোরে অন্যায় কাজকে বৈধ করে দেওয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে অনেকবার লিখেছেন।

বঙ্গবন্ধুকে শ্রদ্ধা জানানোর একটা উপায় হবে, তাঁর চিন্তাভাবনার কাছে বিশ্বস্ত হওয়া। আর কিছু না, তাঁকে যাঁরা অনুসরণ করেন এবং তাঁকে আদর্শ মানেন, তাঁরা যদি এই কাজটি করতেন, তবে দেশটা আরও বেশি গতিশীল হতো, এর উন্নয়নের সুফল সব মানুষের কাছে পৌঁছে যেত, এই দেশে আইনের শাসন থাকত, দুর্নীতির ভয়াবহতা কমত।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ২০ মিনিটের মতো একটি ভাষণে মানুষকে কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন দশের কাজ একজন করতে পারে না, তাতে দশজনকেই হাত লাগাতে হয়। একটা যুদ্ধ একা কেউ লড়াই করে জেতে না। এতে শামিল হতে হয় সব স্তরের যোদ্ধার এবং যুদ্ধের একটা নিশ্ছিদ্র পরিকল্পনাও থাকতে হয়, যা যুদ্ধজয়ে একটা বড় ভূমিকা রাখে। ৭ মার্চের ভাষণে এই প্রতিটি দিক নিয়ে তিনি বলেছিলেন। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার কথা, যা কিছু আছে, তা নিয়ে যুদ্ধ করার আহ্বানও তিনি জানিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পাশাপাশি মুক্তির কথাও তিনি বলে গেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, বাঙালি নিজেকে চেনে না, অর্থাৎ নিজের শক্তিটা চেনে না, সে জন্য তারা গরিব রয়ে গেছে। ‘নিজেকে এরা চেনে না, আর যত দিন চিনবে না এবং বুঝবে না, তত দিন এদের মুক্তি আসবে না (পৃ. ৪৮)।’ বইটির ৯০ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, সরকারের নীতি ভুল হলে সবকিছুতেই ভাটি লাগে। কারণ সরকারকে জানতে হবে, ‘কী করে একটা জাগ্রত জাতিকে দেশের কাজে ব্যবহার করতে হয় এবং জাতিকে গঠনমূলক কাজে লাগানো যায়।’

কথাগুলো মূল্যবান। দেশের কাজে মানুষকে লাগাতে হবে। বাঙালি জাগ্রত জাতি, কিন্তু তাদের একটা অভিন্ন উদ্দেশ্যে একটা জায়গায় শামিল করতে হবে। ষাটের দশকের শুরু থেকেই বঙ্গবন্ধু তা পেরেছিলেন। কারণ, তিনি মানুষকে চিনতেন, নিজেকে তাদের কাতারেই সব সময় দেখতেন। ক্ষমতার দালানে, অফিসে বসে অথবা জনসভার বক্তৃতায় দেশ নিয়ে কথা বললে কোনো কাজ হবে না, তাদের সামনে এসে দাঁড়াতে হবে, দেশের কাজে নেতৃত্ব মাঠে থেকেই দিতে হবে—এ রকম কথা তিনি তাঁর অনেক বক্তৃতায় বলেছেন। তৃণমূলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না করলে, তৃণমূলের নেতৃত্বের হাতে সবাইকে কাজে নামানোর দায়িত্ব না দেওয়া গেলে এবং সেই নেতৃত্বের দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করা গেলে ওই কাজ যে দশের উপকারে লাগবে না, সেটাও মনে রাখতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আরেকটা বক্তৃতা বা ভাষণের কথা উল্লেখ করা যায়, যা নিয়ে তেমন আলোচনা হতে দেখি না, যদিও এর একটা ঐতিহাসিক মূল্য আছে। এটিও তিনি দিয়েছিলেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে, এটিও ছিল সংক্ষিপ্ত, মাত্র ১৭ মিনিটের এবং স্বাধীন বাংলাদেশে এটিই ছিল তাঁর প্রথম ভাষণ। পাকিস্তানি কারাগারে ৯০ দিন কাটিয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে তিনি ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সরাসরি চলে আসেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। মানুষকে বলেন, তাদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নয়, ভাই হিসেবে তিনি কথা বলতে এসে দাঁড়িয়েছেন। দেশটার কাঠামো ও আদর্শ কী হবে, তা নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি তিনি মুক্তিবাহিনী, ছাত্র, শ্রমিক ও রাজনৈতিক কর্মীদের কী কাজ করতে হবে, তা নিয়ে কিছু নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, মানুষের পেটে ভাত আর গায়ে কাপড় না থাকলে স্বাধীনতা ব্যর্থ হবে। বাংলায় যেন আর চুরি, ডাকাতি এবং লুটতরাজ না হয়, তা নিয়ে হুঁশিয়ারি দেন এবং কীভাবে দেশের জন্য কাজ করতে হবে, সে সম্পর্কেও পরিষ্কার করে বলেন। মানুষের কাছে তিনি আবেদন জানান, সামনে যথেষ্ট কাজ, সবাই মিলে কাজে নেমে পড়তে হবে।

এই সবাই মিলে কাজে নেমে পড়াটা মোটেও উদ্দেশ্য এবং পরিকল্পনাহীন নয়। উদ্দেশ্য থাকতে হবে পরিষ্কার, পরিকল্পনাটাও এবং সবাই মিলে, অর্থাৎ যার যা দক্ষতা, সক্ষমতা ও সামর্থ্য, সে অনুযায়ী কাজ করা। এই চিন্তা ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ, সব পরিসরেই সমানভাবে প্রযোজ্য। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর আরেক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘আমি চিন্তাভাবনা করে যে কাজটা করব ঠিক করি, তা করেই ফেলি। যদি ভুল হয়, সংশোধন করে নেই। কারণ, যারা কাজ করে তাদেরই ভুল হতে পারে, যারা কাজ করে না তাদের ভুলও হয় না (পৃ. ৮০)।’

চিন্তাভাবনা করে কাজে নামাটা, কোনো ভুল করলে সংশোধন করে নেওয়ার বিষয়টা যেকোনো কাজ সফল করতে পারে। কাজে নেমে পড়াটাই জরুরি। তবে কাজটা হতে হবে দেশের জন্য; ব্যক্তি, দল বা কোনো মহলের জন্য নয়।