যেভাবে রাজনীতিতে এলেন মরিয়ম নওয়াজ

বর্তমান বিশ্বে জনপ্রিয় তরুণ রাজনীতিকদের মধ্যে মরিয়ম নওয়াজ অন্যতম। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের এই মেয়ে বিশ্বময় পরিচিতি অর্জন করেছেন নিজের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দিয়ে। পাকিস্তানের বর্তমান শাসক ইমরান খানের কড়া সমালোচক হিসেবে তিনি পরিচিত। দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে একই প্লাটফর্মে এনে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিউক্লিয়াসের ভূমিকা রাখছেন এই নারী।

প্রভাবশালী সেনাবাহিনী আর অনেকটাই স্বাধীন বিচারবিভাগকে ‘ম্যানেজ করে’ ইমরান খান ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদি করতে সচেষ্ট হলেও মরিয়ম নওয়াজ ও বিলাওয়াল ভুট্টো সেই পথে কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। প্রাদেশিক নির্বাচনে তাদের নেতৃত্বে ফল ঘরে তুলেছে বিরোধী শিবির।

হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালার মতো মরিয়মের ডাকে পাকিস্তানের বিরোধী দলের যেকোনো সমাবেশে লাখ লাখ মানুষ জড়ো হয়ে যান। পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বেসামাল দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেন মরিয়ম নওয়াজ।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, মরিয়ম নওয়াজ রাজনৈতিক ভাষা শিখেছেন পিপিপির প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেনজীর ভুট্টোর কাছ থেকে। তুখোড় সেই রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করে ইমরান সরকারের ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছেন সুদর্শনী এই রাজনীতিবিদ।

মরিয়ম নওয়াজের জন্ম ১৯৭৩ সালের ২৮ অক্টোবর। বর্তমানে তার ৪৮ বছর চলছে। ১৯ বছর বয়সে তিনি মোহাম্মদ সফদর আওয়ানকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেন। মরিয়মের দুই কন্যা সন্তান এবং এক ছেলে সন্তান আছে। তিনি নানিও হয়েছেন সম্প্রতি।

তিনি স্কুল জীবন কাটান লাহোরের নামকরা স্কুল ‘কনভেন্ট অব জেসাস এন্ড ম্যারি স্কুলে। চিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন মরিয়ম। তাই তিনি লাহোরের কিং এডওয়ার্ড মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তার মন টেকেনি; পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি।

১৯৯২ সালে মরিয়মের বয়স যখন ১৯ তখন তার পিতা নওয়াজ শরীফ তাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন সফদর আওয়ানের সঙ্গে বিয়ে দেন, বিয়ের পরে সফদর সামরিক চাকরি ছেড়ে দেন। মরিয়ম পরে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়, লাহোর থেকে অনিয়মিত ছাত্রী হিসেবে পড়াশোনা করে ২০১২ সালে ডিগ্রি নেন।

২০১৩ সালে মরিয়ম তার বাবার দল পাকিস্তান মুসলিম লীগে (এন) যোগ দেন। ২০১৩ সালের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনে তার বাবা নওয়াজ শরীফের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন মরিয়ম। তিনি এখন মুসলিম লিগের ডেপুটি লিডার।

১৯৯৯ সালে সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফ নওয়াজ শরীফের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করলে মরিয়মকে গৃহবন্দি করা হয়। চার বছর ঘরবন্দি থেকে মরিয়মকে সপরিবারে সেৌদি আরবে পাঠিয়ে দেয় পারভেজ মোশাররফের সামরিক সরকার।

এরপর মরিয়ম ২০১০ সালের দিকে দেশে ফিরে এসে ফের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। ২০১৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে নওয়াজ শরীফের পক্ষে প্রচার প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়টায় তিনি নিজের জাত চেনান। পাকিস্তানের ভবিষ্যত নেতা হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেন। ওই নির্বাচনে নওয়াজ শরীর জয়ী হন। ৩৪২ আসনের মধ্যে ১৬৬ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে মুসলিম লিগ। তৃতীয় বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন নওয়াজ শরীফ। পরিবারের পক্ষ থেকে নওয়াজ বাবাকে রাজনীতিতে সর্বোচ্চ সমর্থন দিয়ে আসছেন।

পানামা পেপারস কেলেংকারিতে নাম আসায় ২০১৮ সালে হাইকোর্টের নির্দেশে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন নওয়াজ শরীফ। এ সময় নওয়াজের পাশাপাশি মরিয়মকেও সাজা দেওয়া হয়।

জেল-জুলুম তোয়াক্কা না করে রাজনীতির মাঠ দাবিয়ে বেড়াচ্ছেন মরিয়ম। ইমরান খানের সরকারের ভুলগুলো চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে যাচ্ছেন। পিপিপিসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে নিয়ে রাজনৈতিক বৃহৎ মোর্চা করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মরিয়ম নওয়াজের জন্য আগামী দিনে চ্যালেঞ্জিং বিষয় হবে সেনাবাহিনীকে বাগে আনা। কারণ পাকিস্তানে শক্তিশালী সেনাবাহিনীর আস্থা অর্জন না করতে পারলে কেউ ক্ষমতায় যেতে পারে না, আবার ক্ষমতায় গেলেও টিকতে পারে না। যেমনটি হয়েছে তার বাবার ক্ষেত্রে। কিন্তু মরিয়ম সেই পথে হাঁটছেন না। তিনি সেনাবাহিনীর সমালোচনা করে যাচ্ছেন।

তথ্যসূত্র: দ্য হিন্দু অবলম্বনে।