মেডিকেল ভর্তি প্রশ্নফাঁস চক্রে চিকিৎসক শিক্ষার্থীসহ ১৫০ জন

মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস চক্রের সঙ্গে চিকিৎসক, শিক্ষার্থীসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রেস কর্মী ও তাদের আত্মীয়রাও জড়িত। গ্রেফতার ৯ আসামির মধ্যে ছয়জনের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এমন অন্তত ১৫০ জনের নাম উঠে এসেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শতাধিক শিক্ষার্থীর নাম পাওয়া গেছে, যাঁরা জালিয়াতির মাধ্যমে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর ও কলেজগুলোকে তাঁদের ব্যাপারে তথ্য দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সর্বশেষ গত ১৪ আগস্ট আসামি সানোয়ার হোসেন ঢাকার মহানগর হাকিম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। আসামিদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে ২০০৬ সালে এমবিবিএস পাস করা জেড এম এ সালেহীন শোভন প্রশ্ন ফাঁসের অন্যতম হোতা।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেন বলেন, ‘প্রমাণ পেলে যারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করে পরীক্ষা দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে ডিএমডির সঙ্গে সমন্বয় করে বিধিগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে প্রশ্ন ফাঁস চক্রের প্রধান জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া ওরফে মুন্নুর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাচ্ছেন তদন্তকারীরা। তাঁর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের মামলা দায়েরের জন্য অনুসন্ধান চলছে। এখনো জসিমের খালাতো ভাই ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রেসের কর্মী আব্দুস সালাম, চিকিৎসক সালেহীন শোভনসহ পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করা যায়নি।

সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে র‌্যাবের হাতে জসিম ও শোভন গ্রেপ্তার হলেও জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের অপকর্মে জড়ান তাঁরা। অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তারা জানান, জবানবন্দিতে যাঁদের নাম এসেছে তাঁদের ব্যাপারে তদন্তের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভাগে তথ্য যাচাই শুরু হয়েছে।

২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন ফাঁস তদন্তের সূত্রে মেডিকেলের প্রশ্ন ফাঁসের তথ্য পায় সিআইডি। গত ১৯ ও ২০ জুলাই রাজধানীর মিরপুর থেকে চক্রের মূল হোতা জসিম, সহযোগী সানোয়ার হোসেন, মোহাইমিনুল ওরফে বাঁধন, জসিমের ছোট বোনের স্বামী জাকির হোসেন দিপু ও ভাতিজা পারভেজ খানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃত এই পাঁচজন এবং পলাতক ৯ জনের নাম উল্লেখসহ দেড় শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করে ২০ জুলাই মামলা করে সিআইডি। এরই মধ্যে জসিমের বোন শাহজাদী আক্তার মিরা, ভগ্নিপতি আলমগীর হোসেন, সহযোগী মুবিন ও ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আদালতের নির্দেশে জসিম, মিরা, আলমগীর, বাঁধন ও সানোয়ারকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে সিআইডি। রিমান্ড শেষে গত ১৪ আগস্ট আদালতে হাজির করা হলে সানোয়ার স্বাীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এর আগে জবানবন্দি দেন আলমগীর, দিপু, পারভেজ, ইমন ও মুবিন।

সিআইডির একাধিক সূত্র জানায়, জবানবন্দিতে সানোয়ার ২০১৩ সালে এবং ২০১৫ সালে প্রশ্ন ফাঁসের কথা জানান। তাঁদের সঙ্গে সালাম ও শোভন ছাড়াও মেডিকেলের কিছু শিক্ষার্থী জড়িত ছিলেন বলেও জানান তিনি। মেডিকেলের চারজনই টাকার বিনিময়ে ভর্তির চুক্তি করতেন।

জসিমের খালাতো ভাই স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মেশিনম্যান আবদুস সালাম প্রশ্ন ছাপানোর সময় তা ফাঁস করতেন। প্রশ্ন ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ যাঁরা করতেন তাঁদের মধ্যে জসিমের ভাতিজা পারভেজ খান, বোনজামাই জাকির হোসেন দীপু, ভায়রা ভাই সামিউল জাফর, দুলাভাই আলমগীর হোসেন, স্ত্রী শারমিন আরা জেসমিন শিল্পী ও ভাগ্নে রবিন রয়েছেন।

সূত্র জানায়, জসিমের কাছ থেকে দুই কোটি ২৭ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, দুই কোটি ৩০ লাখ টাকার চেক এবং পারভেজের কাছ থেকে ৮৪ লাখ টাকার চেক জব্দ করা হয়েছে। জসিমের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

২০১৫ সালে মেডিকেল কলেজে ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অভিযোগ তুলে রাস্তায় নেমেছিলেন শিক্ষার্থীরা। জালিয়াতি ধরা পড়ায় প্রথম দফায় ১৫ জন এবং গত ২৮ জানুয়ারি ৬৩ জনকে বহিষ্কার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। গত বছরের ৩০ মে সিআইডি ১২৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়, যাঁদের ৮৭ জনই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।