বাসের হেলপার থেকে কারখানার মালিক দুলাল ফরাজী

বাসের হেলপারি করে দিনে ৬০-৮০ টাকা আয় দিয়ে কোনোভাবে সংসার চালাতেন দুলাল ফরাজী। সংসারে আরেকটু সচ্ছলতা আনতে স্বপ্ন দেখতেন বাসের চালক হওয়ার। কিন্তু হেলপারির কাজ করতে পারেননি বেশিদিন। কাজ হারিয়ে ঢাকা গিয়ে চাকরি শুরু করেন প্লাস্টিকের কারখানায়। তবে ঘটনাক্রমে সেই চাকরিও হারান দুলাল।

কিন্তু বড় হওয়ার অদম্য ইচ্ছা কখনোই মরে যায়নি তার ভেতর থেকে। শেষে উদ্যোগী হন নিজেই কিছু করার। সামান্য পুঁজি দিয়ে কেনা হ্যান্ড মেশিন দিয়ে ব্যবসা শুরু করে এখন তিনি কারখানার মালিক। ‘তোমাকে আর লাগবে না’ শোনা দুলালের কারখানায় এখন কাজ করেন ১৪ শ্রমিক। দুলাল মাসে তাদের বেতনই দেন ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে নিজের সফলতার সেই গল্প তিনি শুনিয়েছেন।

দুলাল বলেন, ১৯৯৫ সালে মোরেলগঞ্জ শরণখোলা সড়কে বাসের হেলপার হিসেবে কাজ করে প্রতিদিন পেতাম ৬০-৮০ টাকা। সেই টাকায় কোনোভাবে সংসার চলত। নিজেকে আরও একটু সচ্ছল করতে তখন স্বপ্ন দেখতাম বাসের চালক হওয়ার। কিন্তু ভাগ্যের এমন পরিহাস, ২০০০ সালে মালিক বাসের ব্যবসা বন্ধ করে দেয়ায় বেকার হয়ে যাই। বন্ধ হয়ে যায় আয়ের সব পথ। এ অবস্থায় বিয়ে করি। অভাবের তাড়নায় শেষে নববধূকে বাড়ি রেখে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমাই ঢাকায়।

তিনি বলেন, লালবাগের ইসলামবাগ এলাকায় প্লাস্টিকের পট তৈরির কারখানায় কাজ শুরু করি। ৫ হাজার টাকা বেতনে কাজ শুরু করলেও বেতন পেয়েছি ১০ হাজার পর্যন্ত। সংসারে সচ্ছলতা ফেরে। চাকরির সুবাদে পরিচয় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় জড়িতদের সঙ্গে। ২০১৪ সালে হঠাৎ মা মারা যান। সংবাদ পেয়ে বাড়িতে ফিরি। এরপর ঢাকা ফিরলে আর কাজে যোগ দিতে দেননি কারখানার মালিক। তিনি তখন বলেছিলেন, অনেক দেরি হয়ে গেছে এখন আর তোমাকে লাগবে না।

তিনি আরও বলেন, এরপর আবার বেকার হয়ে চিন্তায় পড়ে যাই। পরে ভাবলাম নিজেকেই কিছু করতে হবে। সেই ভাবনা থেকে সামান্য পুঁজি দিয়ে একটি হ্যান্ড মেশিন ক্রয় করি। পরে ওই মেশিন দিয়ে মলম, জর্দাসহ বিভিন্ন প্রকার প্লাস্টিকের কৌটা তৈরি করে বিক্রি করতাম। এক পর্যায়ে এসবিআরএম নামে একটি রড ফ্যাক্টরির এক কর্মকর্তা আমার তৈরি প্লাস্টিকের বিভিন্ন ডিব্বা দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন। পরে ওই কর্মকর্তাই রডের মাথায় লাগানোর জন্য ছোট প্লাস্টিকের ক্যাপের অর্ডার দেন। নিজের পুঁজি না থাকায় তার কাছ থেকে অগ্রিম ৫০ হাজার টাকা নিয়ে কাজ শুরু করি। এক মাসেই দেড় লাখ টাকা আয় হয়।

দুলাল বলেন, এরপর ‘মায়ের দোয়া আব্দুল্লাহ প্লাস্টিক’ নামে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে নিজে কারখানা প্রতিষ্ঠা করি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন লালবাগে নিজের কারখানা হয়েছে। বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার উত্তর বাধালের নিজ গ্রামে বাড়ি হয়েছে। ধানের জমি কিনেছি। সব মিলিয়ে এখন ভালোই আছি।

তিনি বলেন, বর্তমানে ১০টি রড কোম্পানিতে রডের মাথায় ব্যবহৃত বিভিন্ন সাইজের প্লাস্টিকের ক্যাপ সরবরাহ করা হয় আমার কারখানা থেকে। কারখানায় রয়েছে দুইটি আধুনিক মেশিন। সেখানে কাজ করছেন ১৪ জন। তাদের মাসে মোট বেতন দেই ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা।

তিনি আরও বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে মালের সরবরাহ কম। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অর্ডার বাড়ার সঙ্গে আয়ও বাড়বে বলে আশা করছি।

দুলাল ফরাজীর স্ত্রী শাহিদা বেগম বলেন, বিয়ের পরের ১০ বছর অনেক কষ্ট করেছি। বর্তমানে দুই মেয়ে এক ছেলেকে নিয়ে খুব সুখে আছি। আমার স্বামী অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন শুধু আমাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। তার পরিশ্রমের ফলে এখন আমাদের কারখানা, বাড়ি ও জমি হয়েছে। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাতে পারছি। সব মিলিয়ে ভালোই আছি।

ওই কারখানার মেশিন অপারেটর জাহিদুল ইসলাম বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে ১৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করছি। স্ত্রী, সন্তান, মা, ভাই ও বোনদের নিয়ে ভালো আছি। আমার সঙ্গে আরও ১৩ জন এখানে চাকরি করে পরিবার নিয়ে ভালো আছেন।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. আছাদুজ্জামান স্বপন বলেন, দুলাল ফরাজীকে আমরা ছোটবেলা থেকেই চিনি। আট ভাই-বোনের ছোট দুলাল পাঁচ বছর বয়সেই বাবা হারান। তারপর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে জীবন কাটিয়েছে। স্থানীয়দের বাড়িতে কিষান দেয়া, বাসের হেলপারি থেকে শুরু করে অনেক কিছু করেছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ঢাকায় গিয়ে প্লাস্টিকের কারখানা করার মাধ্যমে তার ভাগ্যের পরিবর্তন আসে। আমরা মনে করি সচ্ছল হওয়ার ইচ্ছা শক্তিই দুলাল ফরাজীকে আজকের অবস্থানে এনেছেন। আমরা দুলালের আরও সফলতা কামনা করি।