ফাইনালের মহাযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত মেসি-নেইমাররা

শুধু ফাইনাল নয়, এই লড়াই কার্যত মহারণ। বাঙালির দু’ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ার ম্যাচ। শেষ বার ১৪ বছর আগে কোপা ফাইনালে ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল। মেসি তখন সবে জাতীয় দলের প্রথম একাদশে নিয়মিত জায়গা পাওয়া শুরু করেছেন। নেইমার সেটা তখনও পাননি। জুলিয়ো ব্যাপতিস্তার ব্রাজিল ৩-০ গোলে ধ্বংস করেছিল রবার্তো আয়ালার আর্জেন্টিনাকে।

তারপরে আরও তিনবার ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা। ২০১১ সালে উরুগুয়ে এবং ২০১৫ ও ২০১৬ সালে চিলির কাছে হারতে হয়েছে। সেদিনের তরুণ মেসি আজ ফুটবলজীবনের অন্তিম পর্বে। আপামর ফুটবল সমর্থকই তাঁর হাতে কাপ দেখতে চান।

অন্যদিকে, নেইমার গত বারই কোপা আমেরিকা জিতেছেন। এই ট্রফি তাকে ফুটবলবিশ্বে আরও প্রতিষ্ঠা দেওয়ার ম্যাচ। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার মহারণ দেখতে গেলে আপনাকে উঠতে হবে ভোরে। ৬টায় খেলা শুরু হবে।

আর্জেন্টিনার হেড কোচ স্কালোনি ফাইনালের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে জানালেন, এত বড় ম্যাচ হলেও বিষয়টা নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ আমরা সবাই জানি। কিন্তু সহজভাবে নিতে হবে। সাবধান থাকতে হবে। অবশ্যই জেতার জন্য যা কিছু করা দরকার সবই আমরা করব। আমি ছেলেদের নিয়ে গর্বিত।

লিওনেল মেসির দল পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলেই ফাইনালে এসেছে। চার গোলের পাশাপাশি ৫টি অ্যাসিস্ট মেসির। ফাইনালে নিশ্চিত ভাবেই নিজেদের তালিসমানের দিকে তাকিয়ে থাকবে আর্জেন্টিনা। শিরোপা জিতলে অমরত্ব আর হারলে বরাবরের মতো স্বদেশিদের কাছ থেকে কটূকথা শুনতে হবে সর্বকালের সেরাদের একজনকে।

স্কালোনি অবশ্য এসবের ধার ধারেন না। মেসিকে নিয়ে কোচ বলেন, ওকে কোনো কিছু জিতে কিছু প্রমাণ করতে হবে না। আমরা জানি আর্জেন্টিনা দলে মেসির কী ভূমিকা। কোনো কিছু না জিতলেও সে আমার চোখে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়।

ফাইনালে আর্জেন্টিনা সম্ভাব্য সেরা দলটিই নামাচ্ছেন। অভিজ্ঞতার চেয়ে ফর্মের ওপরই জোর দিচ্ছেন স্কালোনি। যার ফলে সার্হিও আগুয়েরো ও আনহেল দি মারিয়ার বদলে তুলনামূলক কম অভিজ্ঞ কিন্তু ছন্দে থাকা নিকোলো গনসালেস ও পাপু গোমেসকে নামাবেন তিনি।

ডিফেন্সে আর্জেন্টিনার সেরা ডিফেন্ডার ক্রিস্টিয়ান রোমেরো দলের সঙ্গে অনুশীলন করলেও, এখনও শতভাগ ফিট নন। ফলে তার জায়গায় ফাইনালে দেখা যেতে পারে হারমান পেসেলাকে।

ব্রাজিলের ঐতিহাসিক মারাকানায় হচ্ছে ফাইনাল। এই মাঠেই জার্মানির কাছে ২০১৪ বিশ্বকাপের শিরোপা হারায় আলবিসেলেস্তেরা। তবে এসব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন না স্কালোনি।

তিনি বলেন, এটা ফাইনাল ম্যাচ। বুয়েনোস আইরেস, বা চিলির সান্তিয়াগো বা অন্য কোনো খানেই হোক আমাদের সেখানে খেলতে হতো। এটা কিংবদন্তির একটা ভেন্যু কিন্তু আমাদের নিরপেক্ষ ভেবে খেলতে হবে। আমরা ব্রাজিলকে নিয়ে বিশ্লেষণ অরেছি তাদের দলের দুর্বলতা খোঁজার চেষ্টা করেছি। এটা আরেকটা ম্যাচ। যেটা শেষ হলে জীবন তার গতিতেই চলবে।

১৪ বছর পর ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দিদের মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল। টুর্নামেন্টের সেরা দল হিসেবেই শিরোপা লড়াইয়ে তারা। মেসির মতো ব্রাজিলের সেরা তারকা নেইমারও দেশের হয়ে কোপা শিরোপা জেতেননি।

২০১৯ চোতের কারণে খেলতে পারেননি। মাঠের বাইরে বসে দলের জয় দেখতে হয়েছে। রক্ষণভাগ থেকে আক্রমণভাগ। পুরো মাঠে ব্রাজিলের দুর্বলতা চোখে পড়েনি টুর্নামেন্টে।

লাল কার্ড পাওয়া গাব্রিয়েল জেসুস না খেললেও তার জায়গায় এসে ঠিকই সাফল্য পেয়েছেন লুকাস পাকেতা। আর্জেন্টিনার ধীরগতির ডিফেন্সে ওপর পুরো শক্তি নিয়েই ঝাঁপাবেন নেইমার, রিচার্লিসন, পাকেতারা।

আর প্রতিপক্ষের প্রাণ ভোমরা মেসিকে অকার্যকর করে তোলার পরিকল্পনা এঁটেছেন তিতে। ফাইনালে আগে সংবাদ সম্মেলনে ব্রাজিলের মিডফিল্ডার কাসেমিরো বলেন দলীয় ভাবেই মেসিকে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা থাকবে তাদের।

কাসেমিরো বলেন, মেসি যেখানে খেলে, আমিও সেই জোনে খেলি। বহু ম্যাচে পরস্পর পরস্পরের মোকাবেলা করেছি। একা কোনো খেলোয়াড়কে আমার পক্ষে মার্কিংয়ে রাখা সম্ভব না। সতীর্থদের সাহায্য দরকার। একা মার্কিংয়ে মেসিকে রাখা সম্ভব না।

কোপা আমেরিকায় চারজন গোলস্কোরার পেয়েছে ব্রাজিল। অধিনায়ক নেইমারকে আক্রমণভাগে সহায়তা করেছেন রিচার্লিসন, পাকেতা ও রবার্তো ফিরমিনো। রক্ষণে আছেন থিয়াগো সিলভা, দানিলো ও মার্কিনিয়োসের মতো অভিজ্ঞরা।

সব মিলিয়ে ফেভারিট হিসেবে কোপার ফাইনালে মারাকানায় নামছে ব্রাজিল। ফরোয়ার্ড রিচার্লিসনের কথাতেও পাওয়া গেল তার আভাস।

তিনি বলেন, আমরা পারব। এটি কথার কথা নয়, মাঠেও এর প্রমান দিতে পারব। আমরা তাদেরকে উত্তেজিত করে তুলব। সেটি সম্ভব।

মারাকানায় একবারই বড় কোনো ফাইনাল হেরেছে ব্রাজিল। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে উরুগুয়ের কাছে ওই হার ছিল ব্রাজিলের জন্য জাতীয় ট্র্যাজেডি। এবারের মেসির দলের কাছে আরেকটি ট্র্যাজেডি এড়াতে সর্বশক্তি দিয়েই চেষ্টা করবে সেলেকাওরা।

মেসির অমরত্ব নাকি ফুটবল রাজত্বে নেইমার যুগের শুরু? ব্রাজিলের ধারাবাহিকতা নাকি আর্জেন্টিনার শাপ মোচন? কে জিতবে কোপা আমেরিকার ফাইনালে সেটা দেখার অপেক্ষা আর কয়েক ঘণ্টা।

২০০৭ সালের পর প্রথমবার কোনো ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। মারাকানায় ম্যাচ শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টায়।