পুতিন-শি’কে বুঝতে দেরি ব্রিটিশদের

চীন ও রাশিয়ার পশ্চিমা সমর্থকরা যা-ই বলুক না কেন, তারা স্পষ্টই উদার গণতন্ত্রের মূল্যবোধের শক্তিশালী জায়গাগুলোতে আঘাত হানছে এবং দুর্বল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। উদার সমাজের উচিত নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করে এটি প্রতিরোধ করা, হতে পারে সেটা জোটে বিশ্বাসী এমন কোনো প্রেসিডেন্টের অধীনে।

লন্ডন, কেজিবি পরবর্তী রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের থোড়াই কেয়ার মনোভাব এবং চীনের আগ্রাসী লেনিনিজমের অর্থনৈতিক সফলতা যেভাবে মুক্ত গণতন্ত্রকে নষ্ট করছিল, সেটা বুঝতে ব্রিটিশ বেশ দেরি হয়েছে আর প্রতিরোধের কথা না হয় বাদ থাক।

আমি ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহিরাগত বিষয়ক কমিশনার ছিলাম। সে সময় রাশিয়ার সমস্যাগুলো খুব কাছ থেকে দেখেছি। সিলভিও বার্লুসকোনির ইতালির নেতৃত্বে অনেক ইউরোপীয় দেশ ভেবেছিল, তারা পুতিনের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবে এবং তাকে ভুরাজনীতির কৌশলগত বন্ধুতে পরিণত করতে পারবে।

অন্যদিকে, পুতিন বৈশ্বিক শৃঙ্খলাকে উল্টে ইইউ ও ট্রান্সএ্যাটল্যান্টিক জোট উভয়কে ভেঙে ফেলার মনোভাব নিয়ে তার সরকার পরিচালনা করছিলেন। পুতিন সরকার প্রতিবেশীদের বোকা বানিয়ে অন্যান্য দেশে আক্রমণ করেছিল, এমনকি দেশের বাইরে তার সমালোচকদের হত্যা করেছিল।

এছাড়া, প্রতিষ্ঠিত ধনীদের লোভ যে উদার পুঁজিবাদের দুর্বল জায়গা এটা পুতিন এবং তার মিত্ররা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন। ১৯৯০ এবং এই শতাব্দীর কিছু ব্যাপার বিবেচনা করলে দেখা যায়, রাশিয়া কত সম্পত্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অভিজাত রাজনীতিবিদদের হাতের মুঠোয় নিয়েছে।

এতদিন, চীনের আগ্রাসন সেভাবে নজরে আসেনি। কিন্তু বিশ্বব্যাপী নভেল করোনা ভাইরাসের মারাত্মক তাণ্ডব শুরু হলে প্রেসিডেন্ট শি জিপিং তার সরকারের স্বার্থ রক্ষায় এশিয়া ও বিশ্বজুড়ে আগ্রাসী নেতৃত্বে নেমেছেন।

এ সহজ সত্যকে জোর দেওয়া যে চীনাভীতি নয়-এইটা বিশ্বকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির বন্ধুরা বিশ্বাস করাতে চায়। সমস্যাটি সিপিসির নিজের, মাও সেতুং যুগের পর এখন দলে সবচেয়ে আক্রমণাত্মক এবং কট্টরপন্থীরা নেতৃত্বে রয়েছেন।

২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট শি তার দল, সরকার এবং সামরিক কর্মকর্তাদের নির্দেশনা জারি করে উদার মূল্যবোধের প্রতি তার বৈরিতা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর ‘বর্তমান অবস্থার মতাদর্শবিষয়ক আলোচনা’ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে সংসদীয় গণতন্ত্র পর্যন্ত সমস্ত কিছুকে বস্তুকেন্দ্রিক করে ফেলেছে, যা কমিউনিস্ট শাসনের ক্ষতি করতে পারে। হংকং এর জন্য দুর্ভাগ্য, এই শহরের মাধ্যমে শি যেসব মূল্যবোধকে ঘৃণা করেন সেগুলো বের হয়ে এসেছে।

১৯৯৭ সালে হংকংয়ের ওপরে সার্বভৌমত্ব ফিরে পাওয়ার পরে চীন এই মূল্যবোধের প্রতি সম্মান জানানোর কথা থাকলেও, শি এ অঞ্চলকে ভয় দেখিয়ে রুদ্ধ করেছেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইনস্টন চার্চিলের ভাষার এটি পুলিশি শাসনের ‘বিশ্রী উপাদান’। চৈনিক পণ্ডিত পেরি লিংক সিপিসির নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে ‘ঝাড়বাতিতে অজগর’ এর সাথে তুলনা করেছেন: যে কোনও মুহূর্তে এটি আপনাকে ফেলে দিয়ে গিলে ফেলতে পারে। তবে কখন ঘটবে তা আপনি জানবেন না।

জুনের শেষে চীন এই অঞ্চলে হংকংয়ের স্বায়ত্ত্বশাসন এবং আইনের শাসনের ওপর আঘাত হেনে দ্রুত সুরক্ষা আইন চাপিয়ে দেয়। এটি শি’র সাম্প্রতিক অন্যায়ের মধ্যে একটি। গত কয়েকমাসে চীন ভারত থেকে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা থেকে দক্ষিণ চীন সাগর এবং জাপান ও তাইওয়ান থেকে ইউরোপ পর্যন্ত তার জাল ফেলেছে।

অবশ্য যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের কিছু উদারপন্থি দাবি করেছেন, এমন কিছু ঘটছে না অথবা ব্রিটিশদের পক্ষে দাঁড়াতে চীন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। অনুগত হওয়ার অজুহাত বেশ দ্রুত চলে আসে। চীনকে বাহির থেকে পরিবর্তন করা না গেলেও জিনজিয়াংয়ের মুসলিম উইঘুরদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত বর্বরতার যে শাসন চলছে সেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিন্দা করতে কেন পিছবা হবেন?

অন্যান্য সিপিসির বন্ধুরা সতর্ক করে দিয়েছেন বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময়ে চীনা আগ্রাসন নিয়ে না খোঁচানোর জন্য। কারণ যুক্তরাজ্যের এই বাজারটা দরকার। এদিকে, উনবিংশ শতাব্দীতে এসে চীনের প্রতি ব্রিটেনের এহেন আচরণ অথবা অন্যান্য বাজে শাসন ব্যবস্থার সাথে ব্যবসা করার মনোভাব নিয়ে কী বলবেন?

আসলে, এসব তথাকথিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা প্রায়ই যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বার্থকে সংজ্ঞায়িত করে তুলে ধরতে চায় যে, আমরা চীনের অধীনতা কতটুকু মেনে নেই। তবে যুক্তরাজ্য যদি রুখে না দাঁড়ায় তাহলে যে মূল্যবোধের ওপর ব্রিটিশদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত রচিত হয়েছে তার কী হবে? এছাড়া, যুক্তরাজ্য কি একা এখনও এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী?

এখানে, আমি অ্যানি অ্যাপলবামের সাম্প্রতিক বই Twilight of Democracy: The Failure of Politics and the Parting of Friends. পড়তে সুপারিশ না করে পারছি না। অ্যাপলবাম গত তিন দশকে উদার ও উন্মুক্ত সামাজিক মূল্যবোধের ক্ষয়কে বেশ জোরালোভাবে পেশ করেছেন তার যুক্তি ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে।

তাঁর বইটি সকল ডেমোক্র্যাটদের কী শিখতে হবে সেটার পাশাপাশি এক বাস্তবিক অর্থেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে উদার গণতন্ত্রের দুর্যোগপূর্ণ সময়ে কার্ল পপারের লেখা বিখ্যাত The Open Society and Its Enemies, এর কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন।

এক অবাস্তব পরিসরে ও সংকীর্ণ আবেগে ব্রিটেনের রাজনৈতিক অস্তিত্বকে অন্তরীণ করার সুযোগ দিয়ে অনেক ব্রেক্সিট সমর্থকরা সঠিক ও ভুল পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়েছেন। এটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সৃষ্ট প্যারানয়া ও পুনরাবৃত্তিমূলক এক বাসনা।

চীন ও রাশিয়া আগ্রাসন মোকাবিলার জন্য অন্যান্য উদার গণতন্ত্রের সাথে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা দরকার, এই ব্যাপারটিও তারা এড়িয়ে গেছে। যে মূল্যবোধ বিংশ শতাব্দীর রক্ত ভেজা প্রথমার্ধের চেয়ে সুন্দর ও উন্নত দ্বিতীয়ার্ধ ব্র্র্রিটিশদের উপহার দিয়েছে, সেই মূল্যবোধকে রক্ষা করতে ব্রিটেনবাসীদের অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

আমরা জানি কোনটা ঠিক, সেটা রক্ষার জন্য উদার সমাজের মধ্যে জোটে বিশ্বাসী এমন একজন রাষ্ট্রপতির অধীনে আমাদের ইইউ মিত্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এবং ভারত, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ আমাদের এশীয় বন্ধুদের নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। অ্যাপলবাউম আমাদের বহুল পরিচিত একজন ভুল নেতা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ মার্কিন রিপাবলিকান পার্টির প্রবীণ রাজনীতিবিদদেরকে তার আটলান্টিকের আরেকটি অসাধারণ প্রবন্ধে সমালোচনা করে মহান ওয়াডিস্যাও বার্তোসেজেসকিকে স্বরণ করেছেন।

বার্তোসেসিউস্কিকে নাৎসি ও কমিউনিস্ট কারারুদ্ধ করে রেখেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গনের পর তিনি পরবর্তীতে দুই মেয়াদে পোলিশ গণতান্ত্রিক সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। তিনি বেশি বড় ও বিমূর্ত কিছু বলেননি। সবার বোধগম্য একটা সহজ নীতি ছিলো, ‘শিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করুন’। এটা আমার কাছে বেশ জোরালো উপদেশ মনে হয় সব ডেমোক্যাটদের জন্য। সামনের উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে এ ব্যাপারে মনোযোগ দিলে কার্যকরী কিছু হতে পারে।

লেখক: আচার্য, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি হংকং এর শেষ ব্রিটিশ গর্ভনর ও ইইউ এর বহিরাগত বিষয়ক কমিশনার ছিলেন।

স্বত্ত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট।

অনুবাদ: মো. শামীম মাহফুজ স্নিগ্ধ, আন্তজার্তিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষক ও শিক্ষার্থী।