স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে ইউজিসির নির্দেশনায় যা বলছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

‘সাত বছরের মধ্যেই অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে হবে’ মর্মে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে দুই যুগ পার হয়ে গেলেও একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর অগ্রগতি নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম বা সাময়িক অনুমতিপত্র বাতিল করার বিধান থাকলেও দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না ইউজিসি। শুধুমাত্র নোটিশেই দায়সারা পদক্ষেপ নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

ইউজিসির ৪৭তম বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২০ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১০৭টি অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২৯টি স্থায়ী ক্যাম্পাসে, ১৪টি স্থায়ী ক্যাম্পাসে আংশিক ১০টির স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণাধীন, ২১ টি জমি ক্রয় করলেও নির্মাণ কাজ শুরু করেনি।

এছাড়া ২টি ইউনিভার্সিটি নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম জমিতে, ২টি ফাউন্ডেশনের জমিতে ও ১টির জমি না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টি ভ্যাকেট রয়েছে।

এদিকে ইউজিসি বলছে, চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের ২২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থায়ী ক্যাম্পাসে সম্পূর্ণ শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তর করতে হবে। তা না হলে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধসহ আইনি পদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। যদিও ২০১০ সাল থেকেই কয়েক দফায় আল্টিমেটাম দিচ্ছে ইউজিসি। ২০১৭ সালে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য সময় দিয়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সে সময় বলা হয়েছিল- যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই নির্দেশ মানবে না, সেইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করে দেওয়া হবে।

২০০১ সালের ১৩ মার্চ মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অনুমোদনের সময়ে বিরুলিয়ায় স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কথা ছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয়টি এখনো ঢাকার একাধিক স্থানে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এ ব্যাপারে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম জানান, আমাদের আরও কিছুদিন সময় লাগবে। এই ব্যাপারে সময় চেয়ে ইউজিসিকে জানানো হয়েছে।

ইউজিসির সর্বশেষ সতর্কবার্তার তালিকায় রয়েছে নর্দান ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ। তবে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসাইন দাবি করলেন তারা স্থায়ী ক্যাম্পাসে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

তিনি জানান, আমরা তো এখনো কোন নোটিশ পাইনি। আমাদের তো কোন সমস্যা নেই। আমরা তো চলে গেছি। আমাদের স্থায়ী ক্যাম্পাসে ক্লাস-পরীক্ষা হচ্ছে। আমরা জানিয়ে দিয়েছি আমরা স্থায়ী ক্যাম্পাসে চলে আসছি।

অন্যদিকে ১৯৯৬ সালের অনুমোদন পেলেও এখনো স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি দি পিপল’স ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। এ নিয়ে ইউজিসি নির্দেশনা দিয়েছে। তবে কার্যকরী অগ্রগতির শেষ দোহাই ভবন নির্মাণ চলছে ও করোনায় নির্মাণ কাজ থমকে গেছে।

এ ব্যাপারে রেজিস্ট্রার আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, আসাদগেটের এটাও আমাদের স্থায়ী ক্যাম্পাস। নরসিংদীর স্থায়ী ক্যাম্পাস পুরোপুরি নির্মাণ শেষ হয়নি। তবে দুই বছর যাবত ওইখানে আমরা ক্লাস শুরু করেছি। ১১ তলা ভবন হচ্ছে। ইতোমধ্যেই চার তলা পর্যন্ত হয়ে গেছে। পর্যায়ক্রমে আমরা যাচ্ছি।
একসঙ্গে দুইটি জায়গায় পরিচালনার ব্যাপারে তিনি জানান, আসাদগেটেই অনুমোদন রয়েছে। পরে নরসিংদী চলে যাওয়ার ব্যাপারে ইউজিসি মৌখিকভাবে জানায়। সেখানে ২ বিঘা জমি কিনেছি।

ইউজিসির বেঁধে দেওয়া সময় কি কম হয়েছে কিনা প্রশ্নে তিনি জানান, একটু কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। করোনায় ভবন নির্মাণ কাজের অগ্রগতি হয়নি। রাস্তা চওড়া হচ্ছে। সড়ক বিভাগ নোটিশে জানিয়েছে, ভবনের একটি অংশ ভেঙ্গে ফেলতে হবে। ইউজিসিকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে। লিখিতভাবেও জানাবো।

এ ব্যাপারে আরও কথা হয় ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়ার উপাচার্যের অধ্যাপক এমএ ওয়াদুদ মণ্ডলের সঙ্গে। এ অধ্যাপক জানান, স্থায়ী ক্যাম্পাসের ভবনের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ। দ্রুত চলে যাবো। লিখিতভাবে জানিয়েছি।

পার্শ্ববর্তী ভারতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কারা পড়ছে? দেশের শিক্ষার্থীরাই তো পড়ে। প্রতিবছর প্রায় ৪-৫ লাখ শিক্ষার্থী এইচএসসি পাশ করে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এক লাখও নিতে পারে না। বাকিগুলো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে।

প্রশাসনের প্রসঙ্গে টেনে তিনি জানান, তারা ভাবেন প্রাইভেটে পড়া শিক্ষার্থীরা ধনী। ঢাকায় জায়গা পাওয়া কষ্ট। ভারতে জায়গা দিয়ে বাজারমূল্য অনুযায়ী মূল্য নিচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে?

ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়ার স্থায়ী ক্যাম্পাস বর্তমানে যে জায়গায় সেটির প্রায় ১০ শতাংশ ভরাট করতে হয়েছে। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরে ছেড়ে দিলে হবে না, প্রশাসনের দায়িত্ব নিতে হবে।

বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির (এপিইউবি) চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন জানান, জমি কেনা-অবকাঠামো উন্নয়নে অনেক অর্থের প্রয়োজন। কোভিড-১৯ এ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্থিক সংকট বেড়েছে। এতে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় স্থানান্তর প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে পারছে না।

ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ জানান, দফায় দফায় সময় বাড়িয়েছি। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় অনীহা থেকে স্থানান্তরিত হচ্ছে না। সবকিছু বিবেচনায় আমরা কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য হয়েছি। যে বিশ্ববিদ্যালয় এই আইন মানবেন না, সেইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করে দেওয়া হবে।