নাসায় সাফল্য অর্জন: ‘টেন ড্রিমার্স’ এর ধন্যবাদ অনুষ্ঠান

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’র মানব-চালিত রোভার প্রতিযোগিতায় ১১তম হয়েছে বাংলাদেশ-এর বিএসি ইন্টারন্যাশনাল স্টাডি সেন্টার-এর দল ‘টেন ড্রিমার্স’।

সেই উপলক্ষ্যে কোভিড নির্দেশিকা বজায় রেখে একটি ধন্যবাদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে যাচ্ছে টেন-ড্রিমার্স ।

টেন-ডিমার্সের জাহিদ হাসান শোভন জানান, বুধবার(১ সেপ্টেম্বর) বিএসি ইন্টারন্যাশনাল স্টাডি সেন্টারে এই ধন্যবাদ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।
জাহিদ হাসান শোভন জানান, ২০২১ সালের প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়/কলেজ পর্যায়ে নাসা বিশ্ব থেকে মাত্র ২৩টি আন্তর্জাতিক দল নির্বাচিত করে। বিএসি ইন্টারন্যাশনাল স্টাডি সেন্টার-এর দল টেন-ড্রিমার্স-এর রোভার প্রজেক্টস কল বিষয়ে উত্তীর্ণ হওয়ায় নাসার স্বীকৃতি ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি লাভ করে। এর মাধ্যমে টেন-ড্রিমার্স বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে উপস্থাপন করার গৌরব অর্জন করে।
যুক্তরাষ্ট্র-এর ৩২টি দল ও আন্তর্জাতিক ২৩টি দল মিলে সর্বমোট ৫৫টি দল এ প্রতিযোগিতায় ২২টি অ্যামেরিকান অঙ্গরাজ্য ও ৮টি দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায়। তবে, ফাইনাল পর্যন্ত আসে ৪৩টি দল।
প্রতিযোগিতার শর্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ দল ‘টেন-ড্রিমার্স’ প্রাথমিক ডিজাইনকে চূড়ান্ত থ্রি-ডিক্যাডে রূপান্তর করে রিপোর্ট আকারে নাসায় জমা দেয়। দলটি রোভারের ড্রাইভ-ট্রেইনে গতানুগতিক বাইক চেইনের বদলে ব্যবহার করেছে রাবার বেল্ট। অন্যদিকে, দুর্ঘটনা এড়াতে রোভারের চাকায় এয়ারটিউবের বিপরীতে ব্যবহৃত হয়েছে স্প্রিংসেট। এতে আরো আছে, ডুয়াল শক ইন ডিপেন্ডেন্ট সাস্পেনশন সিস্টেম যা উঁচু-নিচু অসমতল পথে ঝাঁকুনি অনেকটাই কমিয়ে আনতে সক্ষম।

মঙ্গলগ্রহ ও চাঁদের জন্য উপযোগী এই রোভারের ডিজাইন করতে সময় লেগেছে ১৮০ ঘণ্টা। পর্যাপ্ত খুঁটিনাটি যোগ করায় ফাইল সাইজ হয়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৫ জিবি। ডিজাইন রিভিউ প্রেজেন্টেশনে নাসার বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশ-এর এই গবেষক দলের এমন উদ্ভাবনী ডিজাইনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
এমন গবেষণাকার্য অব্যাহত রাখতে হলে প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ অর্থের। করোনা মহামারীর প্রকোপে মার্কেটিং যেন হয়ে দাঁড়ায় এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। এ অর্থের মূল খরচ হচ্ছে নাসাতে যাতায়াত। অন্যদিকে, রোভার তৈরি ও প্রোজেক্টের আনুষঙ্গিক কাজের খরচও কম নয়। এভাবে রোভার তৈরি করার জন্য বরাদ্দ প্রায় ৩ মাসের মধ্যে আড়াই মাসই কেটে যায় নানান অনিশ্চয়তায়। অবশেষে কিছু আর্থিক সহায়তা পায় বিএসি ইন্টারন্যাশনাল স্টাডি সেন্টার-এর শিক্ষার্থীরা। তারপরই, রোভার ‘বিএসি ইউনিভার ১.০’ তৈরিতে তিন মাসের কাজ ১৫ দিনে করার সিদ্ধান্ত নেয় দলটি।
অর্থের সংকটে নাসার প্রোজেক্ট-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও নতুন কাঁচামাল ব্যবহার না করে ব্যবহৃত হয় পুরাতন জিনিসপত্র। এখানেই শেষ নয়, করোনার কারণে বেগ পেতে হয়েছে প্রোজেক্ট-এর বিভিন্ন পার্টস সংগ্রহের সময়। সঠিক ওজন, আয়তন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করে রোভার তৈরি করাটা ছিলো কঠিন বিষয়।
অপারেশনাল রেডিনেস রিভিউ রিপোর্টে রোভার-এর টেকনিক্যাল বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। ল্যাব টেস্টের ফলাফল অনুযায়ী, এ রোভারটি পেডেল করে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার গতিতে চালানো সম্ভব। এছাড়া মাত্র ১২ ফুটের মধ্যেই সার্পটার্ন নিতে সক্ষম রোভার ‘বিএসিইউনিভার ১.০’। অন্যদিকে, ভরকেন্দ্র পৃষ্ঠের কাছাকাছি হওয়ায় ৪৫ ডিগ্রি ঢালেও উল্টে যাওয়া সম্ভাবনা কম। তবে, অর্থের অভাবে অ্যালুমিনিয়ামের পরিবর্তে মাইল্ডস্টিল (এমএস) ব্যবহার করায় রোভার-এর ওজন অনেকটাই বেড়ে যায়।
অপারেশনাল রেডিনেস রিভিউ প্রেজেন্টেশনে নাসার বিজ্ঞানীদেরও বিস্মিত করেছে রোভার-এর সক্ষমতা। করোনার প্রকোপ ঠেকাতে অ্যামেরিকা’র সেন্টার ফরডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি)-এর পরামর্শ অনুযায়ী ও ইউএস ডিপার্টমেন্ট অফ স্টেটস-এর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় নাসা এই প্রতিযোগিতার ফাইনাল রাউন্ড ভার্চুয়ালি করার সিদ্ধান্ত নেয়।
৭ এপ্রিল-এর মধ্যে ভিডিও আকারে রোভার প্রদর্শনের জন্য বলা হয়। কিন্তু এ সময় বাংলাদেশ দলকে আকস্মিক লকডাউন– এর মধ্যে পড়তে হয়। পাশের দেশ ভারত-এর দল যেখানে মঙ্গল গ্রহের মতো ভূখণ্ডে রোভার চালিয়ে পরীক্ষা করতে সক্ষম, সেখানে নানান জটিলতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ। তবে হাল না ছাড়ার স্পৃহা ও শেষ পর্যন্ত রোভার প্রদর্শনের সক্ষমতা নাসা বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। তাইতো, নাসার রোভার প্রতিযোগিতার অফিসিয়াল টুইটার ও ফেসবুক পেজ-এর ফিচারে বাংলাদেশ দলকেও রাখা হয়েছে।
সবশেষে, ১৬ এপ্রিল নাসা এ প্রতিযোগিতার ফলাফল জানায়। বিশ্ব থেকে ৪৩টি ফাইনালিস্ট দলের মধ্যে বাংলাদেশ দল ‘টেন-ড্রিমার্স’ গ্লোবাল র‍্যাঙ্কিং-এ ১১তম অবস্থান অর্জন করে।