দোয়া কেন কবুল হয় না, শর্ত কী?

মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে তার শেখানো আদব রক্ষা করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সুরা আরাফের ৫৫ ও ৫৬ নম্বর আয়াতে বলেন, তোমরা তোমাদের রবকে ডাকো বিনয়ের সঙ্গে গোপনে। নিশ্চয়ই তিনি ভালোবাসেন না সীমা লঙ্ঘনকারীদের। আর জমিনে সংস্কার আসার পর তাতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করো না এবং তাকে ডাকো ভয় ও আশা নিয়ে। নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত ইহসানকারীদের অতি নিকটে।

উল্লিখিত আয়াত দুটি থেকে দোয়ার চারটি আদব পাওয়া যায়। যেমন- বিনয়, গোপনীয়তা, ভয় ও আশা। অর্থাৎ আল্লাহকে ডাকতে হবে বিনয়ের সঙ্গে গোপনে ভয় ও আশা নিয়ে। এগুলো দোয়ার সাধারণ আদব। তবে প্রকাশ্যেও দোয়া করা যায়, যা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। রাসুল (সা.) বৃষ্টির জন্য দোয়া করেছিলেন প্রকাশ্যে (বুখারি মুসলিম)।

তাছাড়া দোয়ার আরও কিছু আদব হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। যেমন- ১. আল্লাহর প্রশংসা ও রাসুলের ওপর দরুদ পড়ার মাধ্যমে দোয়া শুরু ও শেষ করা (তিরমিজি, আবু দাউদ, হাকেম); ২. আল্লাহর কাছে চাওয়ার ক্ষেত্রে মনে দৃঢ়তা রাখা অর্থাৎ এভাবে না বলা- ‘হে আল্লাহ তোমার ইচ্ছা হলে দাও’ (বুখারি মুসলিম)। হাদিসে এসেছে, তোমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করো কবুল হওয়ার দৃঢ়বিশ্বাস নিয়ে (তিরমিজি); ৩. দোয়ার মধ্যে ছন্দ না থাকা। ইবনে আব্বাস (রা.) ইকরিমাহকে (রহ.) বলেন, দোয়ার সময় ছন্দ পরিহার করো। কেননা রাসুল ও সাহাবারা এরূপ করেননি (বুখারি); ৪. দোয়ায় বাড়াবাড়ি তথা অতিরঞ্জিত কিছু না বলা।

হাদিসে এসেছে, সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফফাল (রা.) তার ছেলেকে এভাবে দোয়া করতে শুনলেন, ‘হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে জান্নাতের ডান দিকের সাদা কক্ষটি চাই, যেন আমি তাতে প্রবেশ করতে পারি।’ এই দোয়া শুনে তিনি বললেন- ‘ছেলে, আল্লাহর কাছে জান্নাত চাও এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাও।

আমি রাসুলকে (সা.) বলতে শুনেছি, এমন সময় আসবে, যখন মানুষ দোয়ার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করবে’ (ইবনে মাজাহ, আলবানি সহিহ বলেছেন)।

দোয়া কবুল হওয়ার শর্ত: বান্দা আদবের সঙ্গে দোয়া করলে আল্লাহ অবশ্যই কবুল করেন। তবে কয়েকটি কারণে দোয়া কবুল হয় না। যেমন- ১. হালাল জীবিকা দ্বারা জীবনযাপন। এ প্রসঙ্গে রাসুল এক ব্যক্তির উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফর করেছে। তার মাথার চুল এলোমেলো ও ধুলোমলিন। এমতাবস্থায় সে তার হাত দুটি আকাশের দিকে তুলে দিয়ে ‘ইয়া রব ইয়া রব’ বলে ডাকতে লাগল। অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে নিজেও হারাম দ্বারা বেড়ে উঠেছে। কীভাবে তার দোয়া কবুল করা হবে (মুসলিম)? ২. দোয়া কবুলের জন্য তাড়াহুড়া না করা। হাদিসে এসেছে, তোমাদের কারও দোয়া ততক্ষণ কবুল করা হয়, যতক্ষণ না সে কবুলের জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলতে থাকে, ‘আমি দোয়া করলাম, অথচ গ্রহণ করা হলো না’ (বুখারি মুসলিম)! ৩. দোয়ার সময় অমনোযোগী না থাকা। হাদিসের ভাষ্য, জেনে রেখো, আল্লাহ গাফেল ও উদাসীন মনের দোয়া কবুল করেন না (তিরমিজি); ৪. একমাত্র আল্লাহর কাছেই দোয়া করা, যারা আল্লাহকেও ডাকে, আবার গাইরুল্লাহ বা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি-বস্তুর (যেমন- মাজার, পীর, জিন, মূর্তি ইত্যাদি) কাছেও প্রার্থনা করে, তারা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে গণ্য নয়। তাই তাদের দোয়াও কবুল হবে না। আল্লাহ তার বান্দাদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকে ডাকে না… (সুরা ফুরকান, আয়াত :৬৮); ৫. পাপ কিংবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দোয়াও আল্লাহ কবুল করেন না (আহমাদ, তিরমিজি)।

উপরোক্ত আলোচনার আলোকে আমাদের উচিত সদাসর্বদা আল্লাহর কাছে দোয়া করা। দোয়ার যেসব আদব ও শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো পরিপূর্ণ করে দোয়া করা। শুধু বিপদে-মুসিবতে নয়, সুখ ও আনন্দের সময়ও আল্লাহকে ডাকতে হবে। আল্লাহ বলেন, যখন মানুষ বিপদে পড়ে, তখন তারা আমাকে শুয়ে, বসে ও

দাঁড়িয়ে ডাকতে থাকে; অতঃপর যখন আমি তাদের বিপদ দূর করে দিই, তখন তারা এমনভাবে চলে, যেন তারা আমাকে বিপদে পড়ে ডাকেইনি (সুরা ইউনুস, ১২)।

তাছাড়া আল্লাহর কাছে চাইতে হবে সবকিছু, তা যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন। রাসুল বলেন, তোমরা আল্লাহর কাছে চাও, যদিও তা একটি জুতার ফিতাও হোক না কেন।