ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে অস্থিরতা

উপাচার্যের একক সিদ্ধান্তে সিনেট অধিবেশন আহবান করাকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে অস্থিরতা চলছে। আগামী রোববার অনুষ্ঠিতব্য সিনেট অধিবেশনে দুই উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারারসহ অনেক সদস্যই অধিবেশনে যোগ না দেয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, পছন্দের কয়েকজন সিনেট সদস্যকে সিন্ডিকেটে মনোনয়ন দিতেই তড়িগড়ি করে উপাচার্য তার একক সিদ্ধান্তে এ অধিবেশন ডেকেছেন। এ ছাড়া সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট ও ডিনস কমিটির সভায় দুই উপ-উপাচার্যসহ অনেক সদস্যই উপস্থিত ছিলেন না।

জানা যায়, সাধারণত প্রতি বছর জুন মাসের শেষের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের অধিবেশন ডাকা হয়। এ অধিবেশনের অন্যতম আলোচ্যসূচী থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেট উত্থাপন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হয় সিনেট অধিবেশনে।

এ বছর সিনেট অধিবেশন ডাকা হয়েছে আগামী রোববার (১৪ জুন)। যদিও এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট প্রণয়ন হয়নি। এ ছাড়া বাজেট প্রণয়নের পর সেটি ফাইন্যান্স কমিটি (এফসি) ও সিন্ডিকেটে অনুমোদনের পর সিনেটে উত্থাপন করা হয়। যদিও গত বুধবার অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় বাজেট উত্থাপন করা হয়নি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই উপ-উপাচার্য ও ট্রেজারারসহ অধিবেশনে যোগ না নেওয়াদের অভিযোগ, আগামী রোববার অনুষ্ঠিতব্য সিনেট অধিবেশনে তিনজন সিন্ডিকেট সদস্য মনোনয়নের এজেন্ডা রয়েছে। সিনেটের ৩৫ জন শিক্ষক প্রতিনিধিদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৬ জুন। তাই ১৬ তারিখের পর সভা ডাকলে উপাচার্য তার পছন্দের কয়েকজন ব্যক্তিকে সিনেট থেকে সিন্ডিকেটে মনোনয়ন দিতে পারবেন না। মূলত উপাচার্য তার নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কভিড-১৯ এর ঝুঁকির মধ্যেই এ অধিবেশন ডেকেছেন। কেউ কেউ বলছেন, গত সিনেট (২০১৯ সালের ৩১ জুলাই) অধিবেশনে উপাচার্য নির্বাচনের বিতর্কিত প্যানেল গঠনের কার্যবিবরণী অনুমোদন এবং করোনা শনাক্তকরণ কমিটি গঠনসহ কিছু বিষয়ে উপাচার্যের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে কেউ যাতে সিনেটে প্রশ্ন তুলতে বা আলোচনা করতে না পারে; সে জন্য অনুগত স্বল্প সংখ্যক সিনেট সদস্যের উপস্থিতিতে সিনেট অধিবেশন সম্পন্ন করতে চান উপাচার্য।

চিঠি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সভায় অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদ। দ্যা রাইজিং ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, এ অধিবেশনটি বাজেট নিয়ে হওয়ার কথা ছিল। অথচ এখনও বাজেট প্রণয়নই হয়নি। এমনকি ট্রেজারার জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় আয়-ব্যয়ের হিসাবও হয়নি। উপাচার্য এ অধিবেশন ডাকার বিষয়ে আমাদের সঙ্গে আলোচনাও করেনি। আর কিছু নয়; উপাচার্যের মূল উদ্দেশ্যই হলো- শিক্ষক ক্যাটাগরি ও বিশিষ্ট নাগরিক ক্যাটাগরিতে সিন্ডিকেটে মনোনয়ন দেয়া।

একইভাবে চিঠি দিয়ে সভায় অংশ না নেয়ার কথা জানিয়েছেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ। তিনি দ্যা রাইজিং ক্যাম্পাসকে বলেন, উপাচার্য আমাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ছাড়াই এ অধিবেশন আহবান করেছেন। এ পর্যন্ত কোন কখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট অধিবেশন ২৯ জুনের আগে হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আর এ বছর এখন বাজেটের কাজই শেষ হয়নি। তাই চিঠি দিয়ে সভায় অংশ না নেওয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছি।

তড়িগড়ি করে ডাকা সিনেটে উত্থাপনের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট প্রণয়নের জন্য চাপ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক কামাল উদ্দীনের ওপর। যদিও উপাচার্যকে পাঠানো এক দীর্ঘ চিঠিতে এ সময়ের মধ্যে বাজেট প্রণয়ন সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন তিনি। চিঠিতে ট্রেজারার বলেন, “সামগ্রিক পরিস্থিতিতে আর্থিক বিধি-বিধান মেনে ন্যুনতম একটি বাজেট তৈরী করা সম্ভব নয়। বাজেটের বিষয়টি জরুরী মনে করলে, আমি সাময়িক ছুটি নিতে পারি, উপাচার্য মহোদয় প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারেন।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে বর্তমানে শতাধিক সদস্য রয়েছেন। কোভিড-১৯ পরিস্থিতির মধ্যে অধিবেশন ডাকায় বেকায়দায় পড়েছেন অনেক সিনেট সদস্যই। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল মেডিকেল কলেজসহ সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা অনেক সদস্যরই অধিবেশনে যোগ দেয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এদিকে উপাচার্যের পছন্দের সিনেট সদস্যদের বিষয়ে জানতে চাইলে কেউ নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে তাদের অধিকাংশই জানান, ঢাবির ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের প্রাক্তন ডীন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াতুল ইসলামকেই বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ক্যাটাগরিতে সিন্ডিকেটে মনোনয়ন দিতে চান উপাচার্য। এ বিষয়ে একজন উপ-উপাচার্য বলেন, শিবলী রুবাইয়াতের মেয়াদ শেষ হবে ১৬ তারিখ। এরপর তাকে সিনেট থেকে মনোনয়ন দেয়া সম্ভব নয়। গত বছরও তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। যদিও শিক্ষাবিদ ক্যাটাগরিতে সিন্ডিকেটে যাওয়া শিবলী রুবাইয়াতের পিএইচডি ডিগ্রিও নেই। উপাচার্য একজন ব্যক্তিকে সিন্ডিকেটে আনতে সব সিনেট সসদ্যকে কভিড-১৯ তথা মৃত্যুর ঝুঁকিতে ফেলছেন।

তবে সব ধরনের নিয়ম-নীতি মেনেই সিনেটের অধিবেশন ডাকা হয়েছে বলে দাবি করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান। তিনি দ্যা রাইজিং ক্যাম্পাসকে বলেন, কোন ধরনের নিয়ম-নীতির ব্যত্যয় ঘটেছে বলেছে মনে হয় না। অধিবেশনটি সাধারণত বিশ তারিখের পর হয়। এ বছর এগিয়ে আনার একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। সিনেটের ৩৫ জন শিক্ষক প্রতিনিধিদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৬ জুন। এরপর সভা হলে আমরা তাদের সম্মান জানাতে পারব না, ধন্যবাদ দিতেও পারব না। তাই সহকর্মীদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানাতেই অধিবেশন এগিয়ে আনা হয়েছে।