চুয়েট পরিবারের করোনা মোকাবিলা

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তিনি। টিউশনির টাকায় নিজের পড়াশোনা ও খাবার খরচ জোগাতেন। নদীভাঙনের শিকার এক পরিবারের সন্তান, তাই বাবা-মায়ের কাছে টাকাও পাঠাতে হতো। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে টিউশনি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পড়েছেন বিপদে। কীভাবে চলবেন, বাড়িতে খাবার জুটবে কোথা থেকে—আত্মসম্মানবোধের জন্য কাউকে বলতেও পারছিলেন না।

এই ঘোর দুঃসময়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়েরই সাবেক শিক্ষার্থীরা। তাঁর জন্য পাঠিয়েছেন অর্থসহায়তা। শুধু এই শিক্ষার্থী নন, সহায়তা পেয়েছেন আরও ১৫৯ জন শিক্ষার্থী।

আজ যাঁরা প্রাক্তন, তাঁরাই একসময় ১৭১ একরের এই ক্যাম্পাসে তাঁদের জীবনের অনেক সোনালি বিকেল পার করেছেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় তাঁদের নিজের একটা পরিচয় দাঁড় করানোর সাহস দিয়েছে। তাই করোনাকালীন দুর্যোগে অনেকটা কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা দাঁড়িয়েছেন বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশে। হোক প্রাক্তন বা বর্তমান, সবাই তো এই চুয়েট পরিবারের সদস্য।

এপ্রিল মাসের শুরুর কথা। বাংলাদেশে তখন করোনাভাইরাসের প্রকোপটা বেশ ভালোভাবেই শুরু হয়েছে। অন্যদিকে ১৬ মার্চ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে যেসব শিক্ষার্থী টিউশনির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, তাঁরা বিপাকে পড়তে শুরু করেন।

চুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী হাসান জিয়াদ, আরেফিন শিকদার, এ কে এম সাইফুল ইসলাম ও রাঘিব আহমেদ মেসেঞ্জার গ্রুপে আলোচনা করছিলেন, কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই-বোনদের পাশে দাঁড়ানো যায়। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কাজে লাগিয়ে অর্থ সংগ্রহ শুরু করবেন। তাঁদের এই পরিকল্পনা জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জি এম সাদিকুল ইসলামকে। তিনি সব রকম সহায়তার আশ্বাস দেন।

১২ এপ্রিল থেকে ফেসবুকে ‘চুয়েটিয়ান কোভিড ১৯ হেল্প ফান্ড’ নামের গ্রুপের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ শুরু হয়। এ সময় তাঁরা ১৯৯৫-৯৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত প্রতি বর্ষের অন্তত একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে হলেও যোগাযোগ করেছেন। সবার উৎসাহ ও সাড়া পেয়ে কয়েকটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়।

প্রথম প্রকল্পের অধীনে ১৬০ জন শিক্ষার্থীকে উপহার পাঠানো হয় প্রায় ৮ লাখ টাকা। উদ্যোক্তারা জানান, নিম্নমধ্যবিত্ত এই শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করাটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। দক্ষতার সঙ্গে কাজটি সম্পন্ন করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ জি এম সাদিকুল ইসলাম। তিনি গুগল ডকের মাধ্যমে ১৬০ জন শিক্ষার্থীর একটি তালিকা করেন। প্রত্যেকের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে মে মাসের মধ্যেই সবার হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র মানুষ, যেমন চুয়েটের ক্যানটিন ও হলের কর্মচারীদের কথাও ছিল প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মাথায়। তাঁদের সহায়তা করার পাশাপাশি রংপুরে ৬৫টি ও বান্দরবানে ৯১টি পরিবারকে এক সপ্তাহের বাজার পৌঁছে দেওয়া হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রামের ২০০ জন ট্যাক্সিচালককেও দেওয়া হয়েছে ঈদ উপহার।

উদ্যোক্তারা একসময় দেখলেন, চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোর চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা বেশ অবহেলিত। অনেকেই আছেন ভীষণ ঝুঁকিতে। তাই চুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা উদ্যোগ নিয়ে চট্টগ্রাম করোনা ফিল্ড হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মধ্যে পারসোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই), সার্জিক্যাল মাস্ক ও গ্লাভস বিতরণ করেন।

সম্প্রতি চুয়েট থেকে যেসব শিক্ষার্থী স্নাতক হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এখনো স্বাবলম্বী হতে পারেননি কিংবা করোনাকালীন পরিস্থিতিতে চাকরি হারিয়েছেন। উদ্যোক্তারা এমন ২৮ জন শিক্ষার্থীকে ২ লাখ ২৪ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন।

২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী বলছিলেন, ‘এই বিপদের সময় কী করব, ভেবে পাচ্ছিলাম না। শিক্ষক ও বড় ভাইয়েরা ছিলেন বলে সাহস পেয়েছি।’ প্রাক্তনদের পক্ষ থেকে হাসান জিয়াদ বলেন, ‘আমরা আজ যেসব শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছি, তারা যখন প্রকৌশলী হবে, প্রতিষ্ঠিত হবে, তারাও মানুষের পাশে দাঁড়াবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের এসব উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন উপাচার্য মোহাম্মদ রফিকুল আলম। তিনি বলেন, ‘আমাদের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী একদম সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসে। পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে তারা নিজেদের এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের ব্যয়ভার কিছুটা হলেও বহন করে। দেশের এই মহাদুর্যোগের সময় তাদের অনেকে সত্যিই অসহায় হয়ে পড়েছে। এই দুঃসময়ে চুয়েট পরিবারের বড়রা ছোটদের জন্য এগিয়ে এসে শিক্ষক হিসেবে আমাকে গর্বিত করেছে।’