কূটনীতিতে যে বড় পরিবর্তন আনছে ভারত

হঠাৎ করেই ভারতের জাতীয়তাবাদী সরকারের সমঝোতার বেশ কিছু পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপীর নজর কেড়েছে। চীনের বর্তমান আগ্রাসন, আফগানিস্তানে তালেবানদের পুনরুত্থান এবং কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের শীতল সম্পর্কের মাঝে এমন কিছু ঘটে গেছে তাতে ভারতের দিকে উৎসুক চোখ বিশ্বের।

গত কয়েক সপ্তাহের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একটা ঘটনা ঘটে গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সহযোগিতায় গোপনে ভারতীয় এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ২০২১ সালে ফেব্রুয়ারিতে বিতর্কিত কাশ্মীরে ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত অঞ্চল ধরে দুই দেশের অস্ত্র বিরতি চুক্তির পর উত্তেজনা কমাতে শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের খবর সামনে এলো।
আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর কাবুলে পুনরায় ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে তালেবান সশস্ত্র গোষ্ঠী। এমন ভবিষ্যতবাণী করছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তালেবানদের সঙ্গে ভারতের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। যদিও গত বছরের পর থেকে সহিংসতার আশঙ্কায় আফগানিস্তানে দুটি কনস্যুলেট বন্ধ রেখেছে ভারত।
এরই মধ্যে জুনের শেষ সপ্তাহে মোদি সরকার হঠাৎ করেই জম্মু-কাশ্মীরের ১৪ জন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হন। এসব রাজনীতিবিদদের বেশিরভাগই ২০১৯ সালের আগস্টে জম্মু কাশ্মীরের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার সময় আটক করা হয়েছিল। সেই সঙ্গে তারা বিজেপি সরকারের কর্তৃক পৈশাচিক আচরণের শিকার হয়েছিলেন।
এরই মধ্যে উত্তর সীমান্তে ভারতীয় বিজেপি সরকার একটি সচেতন নীতি বজায় রাখে, ২০২০ সালের বসন্তে চীন সেনারা সীমান্ত পেরিয়ে এসে লাদাখের বিতর্কিত অঞ্চলে সংঘাত শুরু করে। তারা ভারতীয় সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক সহিংসতা দেখায়। এতে প্রায় ২০ ভারতীয় সেনা নিহত হয়। সেখানে ১১ দফা আলোচনা সত্ত্বেও চীন সেনা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানায়। অন্যদিকে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ভারত জোরাল ভূমিকা রাখে।

চীনের সঙ্গে এই বৈরিতার মাঝেই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে খারাপ সম্পর্কের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার পর যা ভয়াবহ মাত্রায় শুরু হয়। অন্যদিকে ২০১৯ সালে পাকিস্তানে বালাকোটে ভারতীয় বিমান বাহিনীর বোমা বর্ষণ সেই আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। এরপরে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নিয়ে কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে পরিণত করায় বিশ্বব্যাপী ভারতের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগড়ে দেয় পাকিস্তান। পাকিস্তানের নেতৃত্বে সারাবিশ্বে ভারত বিরোধী প্রচারণা চালানো হয়।
এবার কাশ্মীর প্রসঙ্গে আসা যাক। যে মোদি তার দল জম্মু-কাশ্মীরের কিছু নেতাকে দুর্নীতিবাজ এবং বংশগতভাবে কাশ্মীরের শত্রু বলেছিলেন সেই মোদি সেই সব কাশ্মীরী নেতাদের সঙ্গে তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন। যে মোদি আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কাশ্মীরকে কেন্দ্র শাষিত অঞ্চল করে নেতাদের বন্দি করলেন তাদের আবার মিষ্টি কথা সম্মানজনক প্রটোকল দিয়ে স্বাগত জানালেন।
জম্মু কাশ্মীরে বিজেপি সরকার যা চেয়েছিল কিছুই অর্জন হয়নি। শান্তি এবং উন্নয়ন, সন্ত্রাসবাদের সমাপ্তি, কয়েকটি পরিবারের হাতে জম্মু-কাশ্মীরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ না থাকা এইগুলো ছিল কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ছিনিয়ে নিয়ে বিজেপি সরকারের এজেন্ডা। কিন্তু সেই এজেন্ডা ব্যর্থ তাই পর্যবসিত হয়েছে। তবে কাশ্মীরের নেতাদের সঙ্গে বিজেপি সরকারের বৈঠক তাদের পরাজয়ের স্বীকৃতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
এখানে তিনটি বিষয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। এর মধ্যে একটি ছিল কাশ্মীরী দলগুলির সহযোগিতা, রাজ্যের রাজনৈতিক নির্বাচনী অঞ্চলগুলির একটি নতুন সীমানা কার্যকর করার একটি চুক্তি, যা সম্ভবত রাজ্য বিধানসভায় জম্মু অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব বাড়িয়ে তুলবে। অন্যান্য এজেন্ডা আইটেমগুলি হলো- জম্মু ও কাশ্মীর জুড়ে নির্বাচন এবং এর রাজ্যত্ব পুনরুদ্ধার।
এদিকে মোদি সরকার যা করতে পারে সেটি হচ্ছে জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে দিয়ে ৩৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে মুখে তালা দেবে। তারা বিষয়টিকে ভারতীয় বিচার বিভাগের কাছে ছেড়ে দেবে। যদি এমনটি ঘটে থাকে তবে সেটি হবে মোদি সরকারের আসল বিজয়।
এদিকে পাকিস্তান জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে বিশ্বব্যাপী ভারত বিরোধী যে প্রচারণা চালিয়েছে তা ধোপে টিকেনি। ঠিক এ কারণে পাকিস্তানের নেতাদের ভারতের সঙ্গে কাশ্মীর বিষয়ে সংলাপ শুরুর করার নিজস্ব কারণ রয়েছে। তবে তাদের আলোচনার বিষয়টি আরও একটি একটু খতিয়ে দেখার দরকার ছিল। এদিকে পাকিস্তান যে দু বছর ধরে বলছে পাকিস্তান কাশ্মীর নিয়ে পূর্বশর্ত ছাড়া আলোচনায় বসবে না আর এখন যদি আলোচনার সভার আয়োজনের খবর আমরা শুনি তাহলে এটা বলা যায় যে ভারত সরকারের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক বিজয়।
সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলিতেই স্পষ্ট এই অঞ্চলের রাজনৈতিক খেলাগুলো কোন দিকে গড়াচ্ছে। তবে এর মধ্যে আফগান পরিস্থিতি, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রভাব এছাড়া আফগানিস্তানে তালেবান এবং পাকিস্তান সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর উত্থান এখনও এই বিষয়গুলোকে ভারতের জন্যে ভালো বলা সুযোগ নেই। সেই সঙ্গে পাকিস্তান যদি তাদের মাটি থেকে ভারতে হামলার বিষয়টি ঠেকাতে রাজি না হয় অথবা অক্ষম হয়, তবে কাশ্মীরে শান্তি আসা ব্যর্থ হতে পারে।
এখানে ভারতের সাম্প্রতিক কূটনীতিতে বিজয়ী হতে এখনও অনেক বিষয় রয়েছে তা আমাদের অজানা। তবে আপাতত দৃষ্টিতে অন্তত মনে হয়েছে ভারত সরকার সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছে।

লেখক: ভারতের লোক সভার সদস্য। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীস্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট। অনুবাদক শাশ্বত সত্য।