করোনায় ঝরে গেলো ৩৭ চিকিৎসকের প্রাণ

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিলে শামিল হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বাস্থ্য সেবা দিতে গিয়ে প্রতিদিনই এ তালিকায় যুক্ত হচ্ছেন একাধিক চিকিৎসক। প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে ইতোমধ্যে ঝরে গেছে ৩৭ জন চিকিৎসকের জীবন। এর মধ্যে তরুণ চিকিৎসক থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও রয়েছেন।

সোমবার (১৫ জুন) বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) সভাপতি ডাক্তার মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন এবং মহাসচিব মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়।

চিকিৎসকদের অন্যতম সংগঠন বাংলাদেশ ডক্টর ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) তথ্য অনুসারে মারা গেছেন ৪২ জন চিকিৎসক। এর মধ্যে করোনা সন্দেহভাজন হিসেবে মারা যান ৫ জন, যাদের নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

বিডিএফ ট্রাস্টি বোর্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. কাওসার আলম বলেন, ‘আক্রান্ত ও মারা যাওয়া চিকিৎসকদের সামগ্রিক তথ্যগুলো সংরক্ষণ করছি। আমরা চিকিৎসকদের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত থাকছি। কোভিড যুদ্ধে যেসব চিকিৎসক শহীদ হয়েছেন তাদের জন্য বিএসএমএমইউসহ সকল মেডিকেলে একটি স্মৃতিস্তম্ভ রাখার প্রস্তাবনা তৈরি করছি।’

এদিকে চিকিৎসকদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি রাইটস অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটি (এফডিএসআর) দাবি করছে, চলমান করোনা মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকরা সবচেয়ে বেশি মারা যাচ্ছেন। তাদের মতে, করোনায় প্রাণ হারানোদের মধ্যে চিকিৎসকদের হার ৩ দশমিক শূন্য ৭ ভাগ।

তাদের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত নভেল করোনাভাইরাস এবং এর উপসর্গ নিয়ে ৩৬ জন চিকিৎসক মারা গেছেন, যার মধ্যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে উপসর্গ নিয়ে।

বিএমএসহ পেশাজীবী সংগঠনগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ৩৭ চিকিৎসকের তালিকা নিম্নে তুলে ধরা হলো।

১. সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দীন। গত ১৫ এপ্রিল রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

২. গত ৩ মে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হেমাটোলজিস্ট অধ্যাপক কর্নেল (অব.) ডা. মো. মনিরুজ্জামান।

৩. করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যান রাজধানীর নর্দার্ন মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ এবং ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আনিসুর রহমান। গত ১১ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।

৪. প্রখ্যাত রেডিওলজিস্ট মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) ডা. আবুল মোকারিম মো. মোহসিন উদ্দিন। গত ১২ মে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের (মমেক) একাদশ ব্যাচের এ শিক্ষার্থী।

৫. একই মেডিকেলের ত্রয়োদশ ব্যাচের শিক্ষার্থী ডা. মো. আজিজুর রহমান রাজু মারা যান গত ১৮ মে। তিনি রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

৬. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক ডা. এম এ মতিন। করোনার উপসর্গ নিয়ে সিলেট শামসুদ্দিন আহমেদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২২ মে মারা যান।

৭. ডা. কাজী দিলরুবা। গত ২২ মে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

৮. চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. এস এম জাফর হোসাইন। গত ২৫ মে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

৯. নারায়ণগঞ্জের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি) ডা. আমিনা খান গত ২৬ মে মারা যান। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

১০. অ্যানেস্থেসিয়া ও আইসিইউ বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুর রহমান। করোনার উপসর্গ নিয়ে গত ২৬ মে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

১১. বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজের অর্থোপেডিক বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. মোশাররফ হোসেন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২৭ মে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে মারা যান।

১২. শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন (আর্মি মেডিকেল কোর) ডা. এ এফ এম সাইদুল ইসলাম। করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ২৮ মে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মারা যান।

১৩. সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের চতুর্দশ ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. ওয়াহিদুজ্জামান আকন্দ বাবলু। তিনি রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ৩১ মে মারা যান।

১৪. ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কনসালট্যান্ট ডা. মনজুর রশিদ চৌধুরী। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ২ জুন রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

১৫. চট্টগ্রাম মেরিন সিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. এ এস এম এহসানুল করিম। গত ৩ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

১৬. গত ৩ জুন মারা যান রাজধানীর ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবিয়াল বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. মহিউদ্দিন। রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

১৭. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত ইভালুয়েশন অফিসার ডা. কে এম ওয়াহিদুল হক। তিনি গত ৩ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।

১৮. ফরেনসিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ৪ জুন প্রাইমেট জেনারেল হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

১৯. চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কর্মকর্তা (ইএমও) ডা. মুহিদুল হাসান। গত ৪ জুন চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

২০. ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান (মেডিসিন) অধ্যাপক ডা. এন আই খান মারা যান গত ৪ জুন।

২১. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউরোলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এস এ এম গোলাম কিবরিয়া। তিনি গত ৪ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

২২. রংপুর মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. এহসানুল কবির চৌধুরী গত ৪ জুন মৃত্যুবরণ করেন। তিনি রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

২৩. অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র মেডিকেল অফিসার (সাভার ইপিজেড) ডা. আবুল কাশেম খান। করোনার উপসর্গ নিয়ে গত ৬ জুন রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

২৪. রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও পরিচালক (মেডিকেল সার্ভিসেস) ডা. মির্জা নাজিম উদ্দিন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ৭ জুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

২৫. গত ৮ জুন মারা যান ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. রাজিয়া সুলতানা। তিনি রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

২৬. ময়মনসিংহের ল্যাবএইড হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (অ্যানেস্থেসিয়া) ডা. সাখাওয়াত হোসেন। গত ৮ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

২৭. বরিশালের রাহাত আনোয়ার হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. আনোয়ার হোসেন। গত ৯ জুন রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

২৮. রাজধানীর ইমপালস হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ ও সিনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. জলিলুর রহমান। গত ৯ জুন ইমপালস হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

২৯. গত ১০ জুন মারা যান রাজধানীর জেড এইচ শিকদার ওমেন্স মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. তানজিলা রহমান। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

৩০. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেডিয়াট্রিক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. গাজী জহিরুল হাসান। গত ১২ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।

৩১. গত ১২ জুন মৃত্যুবরণ করেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (কার্ডিওলজি বিভাগ) ডা. মাহমুদ মনোয়ার।

৩২. রাজধানীর জেড এইচ শিকদার ওমেন্স মেডিকেল কলেজের চক্ষু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল হক। করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১২ জুন মারা যান।

৩৩. ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. আরিফ হাসান। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১২ জুন মারা যান।

৩৪. রাজধানীর বিআরবি হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান ডা. মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন। গত ১৩ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

৩৫. চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ১৭তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষাথী ডা. সাদেকুর রহমান ১৪ জুন মারা যান। তিনি চট্টগ্রাম মা-শিশু ও জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

৩৬. একই দিন মারা যান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (ডেন্টিস্ট্রি) ডা. নজরুল ইসলাম। রাজধানীর মহাখালীতে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশে (আইসিডিডিআরবি) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

৩৭. সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ও বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. একেএম মুজিবুর রহমান আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) ভোর সাড়ে ৫টায় মারা যান। রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসারত অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

করেনায় সন্দেহভাজন মৃত্যু

১. ফরেনসিক মেডিসিনের অধ্যাপক ডা. আনিসুর রহমান গত ১১ মে মারা যান। তিনি ছিলেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ১১ত ব্যাচের শিক্ষার্থী।
২. গত ২২ মে মারা যান চট্টগ্রাম মা ও শিশু জেনালে হাসপাতালের ডা. জাফর হোসাইন রুমি।
৩. গত ২৮ মে মারা যান ডা. তাজুদ্দিন।
৪. ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এন আই খান ৪ জুন ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
৫. গত ৩ জুন মারা যান অধ্যাপক ডা. মাহবুবুর রহমান খান।

সূত্র: মেডিকেল ভয়েস