এসএসসি পাসেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি

এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার সার্টিফিকেট দিয়েই রাজধানীর বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর অভিযোগ উঠেছে। শুধু ভর্তিই নয়; একাধিক ইউনিভার্সিটিতে চলমান সেমিস্টারে ক্লাসও করতে পারছেন রেজাল্টের অপেক্ষায় থাকা শিক্ষার্থীরা।বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি বলছে, উন্নত বিশ্বে এভাবে ভর্তির সুযোগ দেয়া হয়। তাছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী যেহেতু এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা হচ্ছে না, তাই হয়তো কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির সুযোগ দিচ্ছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ভাষ্য, এইচএসসি রেজাল্টের আগে শিক্ষার্থী ভর্তির কোনোই সুযোগ নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বলছে, যেহেতু এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা হচ্ছে না, সেহেতু এবার সবাই পাস করবে। তাই তারা শিক্ষার্থী ধরে রাখতে প্রোভেশনাল (সাময়িক) ভাবে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করে রাখছেন। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য, তারা যদি ভর্তি না করান, তবে অন্যরা ঠিকই ভর্তি করিয়ে নেবে। তাই তারা শিক্ষার্থীদের হাত ছাড়া করতে চান না। যদিও ইউজিসি’র নীতিমালা অনুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য একজন শিক্ষার্থীকে এইচএসসিতে নূন্যতম একটি জিপিএ পেতে হয়। যা না পেলে কোনোভাবেই সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্য নয়।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউজিসির সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. ফেরদৌস জামান শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের দেশের আইন অনুযায়ী এইচএসসি রেজাল্ট প্রকাশের পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোনো সুযোগ নেই। এভাবে যদি কেউ ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করায়, তাহলে সেটি অবৈধ ভাবে ভর্তি করিয়েছে বলেই বিবেচ্য হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, উত্তরার কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, গাবতলীতে অবস্থিত ইউরোপিয়ান ইউভিার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং বসুন্ধরা এলাকায় অবস্থিত ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এসএসসি পাসের সার্টিফিকেট দিয়েই শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিচ্ছে। এদের মধ্যে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি ও ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি চলমান ফল-২০২০ সেমিস্টারে রেজাল্টের অপেক্ষায় থাকাদের ভর্তি নিয়ে ক্লাসও শুরু করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ফলাফলের অপেক্ষায় থাকা এক শিক্ষার্থী জানান, আমি কয়েকদিন পূর্বে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির বিষয়ে জানতে গিয়েছিলাম। তারা বলেছে, আমি রেজাল্ট প্রকাশ না হলেও তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবো। এক্ষেত্রে তারা আমার জেএসসিতে প্রাপ্ত জিপিএর ৩০ শতাংশ এবং এসএসসিতে প্রাপ্ত জিপিএর ৭০ শতাংশ ধরে আমার আনুমানিক একটা এইচএসসির রেজাল্ট হিসেব করেছে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মিলান পাগন এবং রেজিস্ট্রার এম আনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে জনসংযোগ ও গণমাধ্যম পরিচালক খন্দকার আমিনুল হক দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘আমরা কোনো শিক্ষার্থীকে ভর্তি করাচ্ছি না। তাদের প্রোভেশনাল হিসেবে আবেদনের সুযোগ দিচ্ছি। যদি আপনাকে কেউ এমন তথ্য দিয়ে থাকে তাহলে বিষয়টিকে তিনি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। এ বছর যেহেতু এইচএসসি পরীক্ষা হচ্ছে না, সেহেতু সবাই পাস করবে। আর এই বিষয়টি মাথায় রেখেই আমরা শর্ত সাপেক্ষে শিক্ষার্থীদের আবেদনের সুযোগ দিচ্ছি।’

এদিকে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে রেজাল্টের অপেক্ষায় থাকা ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তির বিজ্ঞাপন দিয়েছে। অ্যাডমিশন অফিসে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, আগামী ১২ নভেম্বর পর্যন্ত তাদের ভর্তি কার্যক্রম চলবে। এইচএসসি ফলাফলের অপেক্ষায় থাকা কিছু শিক্ষার্থী চলমান সেমিস্টারে ভর্তি হয়ে ক্লাসও করছেন। রেজাল্ট না পেয়ে ভর্তি হলে পরবর্তীতে কোনো সমস্যা হবে কিনা— এমন প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, নিশ্চিন্তে ভর্তি হওয়া যাবে। কোনো সমস্যা হবে না।

যদিও চলমান সেমিস্টারে শিক্ষার্থী ভর্তি ও ক্লাসের কথা অস্বীকার করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. সহিদ আখতার হোসেন। দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে তিনি বলেন, আমার জানা মতে, আমরা স্প্রিং-২০২১ সেমিস্টারের জন্য প্রোভেশনাল হিসেবে শিক্ষার্থী ভর্তি করাচ্ছি। ভর্তি নীতিমালায় যে যোগ্যতা দেয়া আছে; শিক্ষার্থীরা যদি সেটি পূরণ করতে না পারে তবে পরবর্তীতে তাদের ভর্তি বাতিল করা হবে। প্রোভেশনাল হিসেবে ছাত্র-ছাত্রীদের সার্টিফিকেট ছাড়াই ভর্তি করানো যায় বলেও জানান তিনি।

কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ভর্তি শাখায় যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, আগামী ২৬ নভেম্বর থেকে তাদের মিডটার্ম পরীক্ষা শুরু হবে। পরীক্ষার পূর্ব পর্যন্ত তারা শিক্ষার্থী ভর্তি করাবেন। ভর্তির উপর আকর্ষণীয় ছাড়ও দিচ্ছেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভর্তির ভিন্ন ভিন্ন সেশন রয়েছে জানিয়ে তারা বলেন, ‘আমরা চলমান সেমিস্টারে এইচএসসি ফল প্রত্যাশীদের ভর্তি করাচ্ছি’।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মাহফুজুল ইসলাম দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, আমাদের এখানে এইচএসসি পরীক্ষায় পাস না করে ভর্তির কোনো সুযোগ নেই। অ্যাডমিশন অফিস থেকে যে তথ্য দেয়া হয়েছে, সেটি হয়তো স্প্রিং-২০২১ সেমিস্টারের হবে। কেননা আমাদের ফল-২০২০ সেমিস্টারের ক্লাস অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। ২৬ তারিখ থেকে আমাদের পরীক্ষা শুরু হবে।

এছাড়া ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি এবং ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের ভর্তি দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে সেখান থেকেও শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হচ্ছে বলে জানানো হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. মকবুল আহমেদ খান দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আপনাকে ভর্তির বিষয়ে যে তথ্য দেয়া হয়েছে সেটি ভুল তথ্য। আমাদের এই সেমিস্টারে কোনো শিক্ষার্থীই ভর্তি হয়নি।

নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আব্দুস সালাম মোল্লা। তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পাস না করলে তাকে ভর্তি কেন নেয়া হবে? অ্যাডমিশন অফিস থেকে বিষয়টি জানানো হয়েছে- এ বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এখন বাসা থেকে অফিস করি। তাই এই বিষয়ে বলতে পারছি না।

তথ্যমতে, এইচএসসি ও সমমানের রেজাল্টের অপেক্ষায় থাকা শিক্ষার্থীদের এই সকল ইউনিভার্সিটি ভর্তি ফরমে ‘অ্যাপেয়ার্ড’ অথবা ‘প্রোভেশনাল’ লিখে ভর্তি করাচ্ছে। পরবর্তীতে রেজাল্ট প্রকাশের পর তারা পূর্ণ ভর্তি হিসেবে উল্লেখ করবেন। তবে ফলাফল প্রকাশের পূর্বে কোনভাবেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ নেই বলে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে ইউজিসি।

ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির নীতিমালা থেকে জানা যায়, জেনারেল শাখার ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তির ক্ষেত্রে অবশ্যই একজন শিক্ষার্থীকে উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এছাড়া তাকে নূন্যতম ২.৫০ জিপিএ পেতে হবে। কোনোক্রমেই এইচএসসি পাস না করা শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না। এক্ষেত্রে যদি কেউ ভর্তি হয় তাহলে সেটি অবৈধ বলে বিবেচিত হবে।

এ বিষয়ে ইউজিসির সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. ফেরদৌস জামান বলেন, ইউজিসির ভর্তি নীতিমালায় জেনারেল শিক্ষা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলে তাকে উচ্চ মাধ্যমিকে পাস করতে হবে। এছাড়া তার জিপিএ ২.৫০ হতে হবে। ‘প্রোভেশনাল’ কিংবা ‘অ্যাপেয়ার্ড’ কোনো নিয়মেই এইচএসসি পাস করার পূর্বে শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর সুযোগ নেই। যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ছাত্র-ছাত্রীদের এইচএসসি সার্টিফিকেট না থাকার পরও ভর্তি করাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।

এসএসসি পাসের সার্টিফিকেট দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির (এপিইউবি) সভাপতি শেখ কবির হোসেন দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় যেহেতু ঘোষণা দিয়েছে যে, এবছর এইচএসসি পরীক্ষা হবে না। সেহেতু এবছর সবাই পাস করবে সেটি বোঝাই যাচ্ছে। সেজন্য হয়তো কিছু ইউনিভার্সিটি শিক্ষার্থীদের ভর্তির সুযোগ দিতে পারে। এছাড়া ইউজিসি ভর্তির বিষয়ে এখনো কোনো নির্দেশনা দেয়নি।

ইউজিসির ভর্তি নীতিমালায় উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থীকে এইচএসসি পাস করতে হবে বলা আছে বললে তিনি জানান, উন্নত বিশ্বে এভাবে ভর্তির সুযোগ দেয়া হয়। আশা করছি ইউজিসিও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের নীতিমালা কিছু পরিবর্তন আনবে।

আবেদনের সুযোগ দিচ্ছে ইস্ট ওয়েস্ট-এনএসইউ-ব্রাক

এদিকে এসএসসি পরীক্ষার সার্টিফিকেট দিয়েই শিক্ষার্থীদের আবেদনের সুযোগ দিচ্ছে দেশের প্রথম সারির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। করোনার কারণে এ বছর ভর্তি পরীক্ষার নেয়া থেকে সরে এসেছে ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়। ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার পর তারা অনলাইনে শিক্ষার্থীদের মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ভর্তি করাবে। আর ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষার্থী ভর্তি করাবে। সশরীরে অথবা অনলাইনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুদের আবেদনপত্র গ্রহণ করা হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বর মাসে তাদের ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে।