উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাইবার দুর্বলতা

পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ডেটা সেন্টারে গত ১৪ আগস্ট ভয়াবহ সাইবার হামলা চালায় হ্যাকাররা। ডেটা সেন্টারটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিল দেশটির ফেডারেল বোর্ড অফ রেভিনিউ (এফবিআর)। ওই ডাটাবেসে দেশটির সব নাগরিকের সম্পদ, আয় এবং ব্যয়ের বিবরণ তালিকা ছিল। যার পরিমাণ প্রায় কয়েক ট্রিলিয়ন রূপি। সাইবার হামলায় তা সবই বেহাত হয়েছে।

শুধু তাই নয়, ভয়াবহ ওই সাইবার হামলায় বেহাত হয়েছে দেশটির সব ব্যবসায়ীর পণ্যের চালানের তথ্য। হ্যাকাররা এফবিআরের অধীনে থাকা সবগুলো ওয়েবসাইট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তা বন্ধ করে দেওয়ায় স্থবির হয়ে পড়ে দেশটির আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। তবে সংস্থাটি ওয়েবসাইট হ্যাক হওয়ার তথ্য গোপন করে।

কর কর্তৃপক্ষের সবগুলো ওয়েবসাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে এক বিবৃতিতে এফবিআর জানায়, অধিকতর সেবা নিশ্চিত করতে তারা ওয়েবসাইটগুলোর উন্নয়নে কাজ করছে। ফলে সেগুলো আপাতত ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিষয়টিকে সাময়িক সমস্যা উল্লেখ করে এর জন্য সময় চেয়ে দুঃখ প্রকাশও করে সংস্থাটি!

এই সাইবার হামলার তিন দিন আগে গত ১১ আগস্ট হুয়াওয়ের হয়ে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ঠিকাদার কোম্পানি ‘বিজনেস ইফিসিয়েন্সি সলিউশন এলএলসি (বিইএস)’ চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ক্যালিফোর্নিয়া জেলা আদালতে একটি মামলা দায়ের করে। যেখানে তারা দাবি করে যে, পাকিস্তানের জন্য ‘সেফ সিটি’ নামক একটি প্রজেক্টে ব্যবহার করার জন্য হুয়াওয়ে তাদের কাছে এমন একটি সিস্টেম চেয়ে আবেদন করেছে যা চীনে সেটআপ করে লাহোরে নজরদারি চালানো যায়। উল্লেখ্য, ২০১৬ সালে ‘লাহোর সেফটি প্রজেক্ট’ এর সফটওয়্যার এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে বিইএস এর সঙ্গে চুক্তি করে হুয়াওয়ে।

মামলায় বিইএস অভিযোগ করেছে, চীনের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে লাহোরে সেফটি প্রজেক্টের মাধ্যমে দেশটির বাণিজ্য, বিদেশি নাগরিকদের রেজিস্ট্রেশন, পাকিস্তানের নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, করদাতাদের কর ও সম্পদের তথ্য এমনকি নাগরিকদের গোপন তথ্যও সংগ্রহ করেছে। তাদের সংগ্রহ করা এসব তথ্য পাকিস্তান সরকারের ডেটাবেসে জমা করা হয়েছে। পাকিস্তান তা অপরাধ দমনে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করছে। বিইএস অভিযোগ করে, হুয়াওয়ে নজরদারি চালানোর মাধ্যমে চীন-পাকিস্তানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ তথ্যগুলো ডিইএস (ডেটা এক্সচেঞ্জ সিস্টেম) এর মাধ্যমে গোপনে হাতিয়ে নিচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ২০১৭ চীনের সুজুতে প্রথম একটি ডুপ্লিকেট ডিএসই বসায় হুয়াওয়ে। যার মাধম্যে পাকিস্তানের লাহোরের ডেটাবেইসে তারা অ্যাকসেস পায়।

এমন কর্মকাণ্ডের পরেও হ্যাকিংয়ের শিকার হওয়া এফবিআরের পক্ষে হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ, অন্যান্য দেশের তুলনায় চীনা এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ‘সেফ সিটি প্রজেক্ট’ এর মাধ্যেমে অসংখ্য চুক্তি করেছে পাকিস্তান। ফলে অপরাধ যাইহোক, কার্যত তার দায়মুক্তি নিয়েই রেখেছে বিশ্বব্যাপী বিতর্কিত এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটি। ইতোপূর্বে চীনের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে হুয়াওয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া, এ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের যেকোনো ধরনের পণ্য কেনার বিষয়েও সতর্ক করেছে মার্কিন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। একই অভিযোগে গুগল, ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো হুয়াওয়ের নির্মিত ফোনে তাদের পরিসেবা বন্ধ করে দিয়েছে।

একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সম্প্রতি ইসরায়েলের সরকারি ও বেসরকারি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলা চালিয়েছে চীন। তাদের কাছ থেকে লভ্যাংশের একটি অংশ দাবি করেছে তারা। ইরান, সৌদি আরবসহ অন্যান্য দেশেও চীন একই ধরনের সাইবার হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাকিস্তান কর্তৃকপক্ষ যখন এফবিআর এর হ্যাক হওয়া তথ্য যাচাই করছে তখন তাদের উচিত হবে হুয়াওয়ের জমাকৃত তথ্যও পরীক্ষা করে দেখা। তখনই বের হয়ে আসবে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাকিস্তানের ‘অল ওয়েদার ফ্রেন্ড (সব আবহাওয়াতেই ভালো বন্ধু)’ চীন তাদের প্রযুক্তি পণ্য হুয়াওয়েকে দিয়ে আসলে কী করেছে!