ঈদে লকডাউন প্রসঙ্গে যা বললেন প্রতিমন্ত্রী

দেশব্যাপী করোনার উচ্চ সংক্রমণ রোধে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে কঠোর লকডাউন আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। সোমবার (৫ জুলাই) সময় নিউজকে এ কথা জানান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের যে বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন, তাদের পরামর্শ এবং আমাদের টেকনিক্যাল কমিটির পরামর্শ অনুযায়ী লকডাউন বাড়ানো হয়েছে। আমাদের এ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হচ্ছে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা। তাই সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ বিধিনিষেধ বাড়ানো হয়েছে।
ঈদের আগে পরিস্থিতি বিবেচনায় কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে ফরহাদ হোসেন বলেন, প্রতিনিয়ত আমরা দেখছি করোনা সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে ওঠা-নামা করছে। তাই পরিস্থিতি বিবেচনায় আমরা সিদ্ধান্ত নেব। আগামী ১২ অথবা ১৩ তারিখে পরবর্তী সিদ্ধান্ত দিতে পারব। গভীরভাবেই এ বিষয়টি মনিটরিং করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, গতবার মানুষ যেভাবে বাড়িতে গেল, তার প্রতিফলন আমরা পাচ্ছি। সেই বিষয়টি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই এবার সে বিষয়ে সরকার পরিকল্পনা করছে। সেই বিষয়ে আমরা চেষ্টা করছি যে কীভাবে ওই পরিস্থিতি আমরা মোকাবিলা করব। কারণ যেভাবে ব্যাপকভাবে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে, তা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তাই যদি ২২ তারিখে ঈদ হয়, তবে আমাদের তৃতীয় সপ্তাহে কী করা উচিত, তা নিয়ে ভাবতে হবে। আমাদের পর্যবেক্ষক কমিটি প্রথম সপ্তাহ ও দ্বিতীয় সপ্তাহ দেখবে। তারপর আমরা আবার বসব। তখন পরিস্থিতি বুঝে আমাদের জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির পর্যবেক্ষণে থাকবে। পরিস্থিতি বুঝে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারব।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ঈদের সময় নিয়ন্ত্রণ করাটা খুব কঠিন একটা কাজ। ওই সময়টাতে কী কী থাকবে, কী করলে ভালো হবে, কীভাবে করলে ভালো হবে, সে বিষয়ে সরকার পরিকল্পনা করছে। সময় হলে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত জানাতে পারব। লকডাউনের সুফলটা ধরে রাখতে ওই সময়টাতেও চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

মহামারি করোনা রোধে সারা দেশে চলমান কঠোর বিধিনিষেধের (লকডাউন) মেয়াদ আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে। আগামী ১৪ জুলাই পর্যন্ত মেয়াদ বাড়িয়ে সোমবার (৫ জুলাই) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ আদেশ জারি করা হয়।
এর আগে ১ জুলাই (বৃহস্পতিবার) থেকে সাত দিনের কঠোর লকডাউনের প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সরকারের পক্ষ থেকে এবার বিধিনিষেধ ‘কঠোর’ই করার কথা বলা হয়। প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হলেই গ্রেপ্তার করার কথা বলে পুলিশও। বিধিনিষেধ মানতে বাধ্য করতে মাঠে নামানো হয় সেনাবাহিনীও।
লকডাউন নিয়ে গত ৩০ জুন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়:
করোনা সংক্রমণ রোধে সারাদেশে সকল সরকারি-বেসরকারি-স্বায়ত্তশাসিত অফিস বন্ধ করে সাত দিনের লকডাউন ঘোষণা করেছে সরকার। লকডাউনে বন্ধ থাকবে গণপরিবহন-শপিংমল। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চালু থাকবে শিল্পকারখানা।
৭ দিনের এই লকডাউনে কেউ বিনা প্রয়োজনে ঘর থেকে বাইরে বের হলেই কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ১. সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত ও বেসরকারি অফিসসমূহ বন্ধ থাকবে।
২. সড়ক, রেল ও নৌ-পথে গণপরিবহন (অভ্যন্তরীণ বিমানসহ) ও সকল প্রকার যন্ত্রচালিত যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে।
৩. শপিংমল/মার্কেটসহ সকল দোকানপাট বন্ধ থাকবে।
৪. সকল পর্যটন কেন্দ্র, রিসোর্ট, কমিউনিটি সেন্টার ও বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ থাকবে।
৫. জনসমাবেশ হয় এ ধরনের সামাজিক (বিবাহাত্তোর অনুষ্ঠান (ওয়ালিমা), জন্মদিন, পিকনিক, পার্টি ইত্যাদি), রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বন্ধ থাকবে।
৬. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আদালতসমূহের বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করবে।
৭. ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করবে।
৮. আইনশৃঙ্খলা এবং জরুরি পরিসেবা, যেমন- কৃষি পণ্য ও উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি), খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্য পরিবহন, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্য সেবা, কোভিড-১৯ টিকা প্রদান, রাজস্ব আদায় সম্পর্কিত কার্যাবলি, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস-জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, টেলিফোন ও ইন্টারনেট (সরকারি-বেসরকারি), গণমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া), বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ডাক সেবা, ব্যাংক, ফার্মেসি ও ফার্মাসিটিক্যালসসহ অনান্য জরুরি/অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবায় সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিসসমূহের কর্মচারী ও যানবাহন প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে যাতায়াত করতে পারবে।
৯. পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত ট্র্যাকলরির/কাভার্ড ভ্যান/কাগো ভেসেল এ নিষেধাজ্ঞার আওতা বহির্ভূত থাকবে।
১০. বন্দরসমূহ (বিমান, সমুদ্র, নৌ ও স্থল) এবং তৎসংশ্লিষ্ট অফিসসমূহ এ নিষেধাজ্ঞার আওতাবহির্ভূত থাকবে।
১১. শিল্প-কারখানাসমূহ স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণপূর্বক নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চালু থাকবে।
১২. কাঁচাবাজার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত উন্মুক্ত স্থানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে। সংশ্লিষ্ট বাণিজ্য সংগঠন/বাজার কর্তৃপক্ষ স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি নিশ্চিত করবে।
১৩. অতি জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত (ঔষধ ও নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রা, চিকিৎসা সেবা, মৃতদেহ দাফন/সৎকার ইত্যাদি) কোনোভাবেই বাড়ির বাইরে বের হওয়া যাবে না। নির্দেশনা অমান্যকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
১৪. টিকা কার্ড প্রদর্শন সাপেক্ষে টিকা গ্রহণের জন্য যাতায়াত করা যাবে।
১৫. খাবারের দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খাবার বিক্রয় (Online/Take away) করতে পারবে।
১৬. আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু থাকবে এবং বিদেশগামী যাত্রীরা তাদের আন্তর্জাতিক ভ্রমণের টিকেট প্রদর্শন করে গাড়ি ব্যবহারপূর্বক যাতায়াত করতে পারবে।১৭. স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে মসজিদে নামাজের বিষয়ে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় নির্দেশনা প্রদান করবে।
১৮. ‘আর্মি ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার‘ বিধানের আওতায় মাঠ পর্যায়ে কার্যকর টহল নিশ্চিত করার জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ প্রয়োজনীয় সংখ্যক সেনা মোতায়েন করবে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্থানীয় সেনা কমান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত করবেন।
১৯. জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে সমন্বয় সভা করে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব ও আনসার নিয়োগ ও টহলের অধিক্ষেত্র, পদ্ধতি ও সময় নির্ধারণ করবেন। সে সঙ্গে স্থানীয়ভাবে বিশেষ কোনো কার্যক্রমের প্রয়োজন হলে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগসমূহ এ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করবে।
২০. জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মাঠ পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করবে।
২১. স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তার পক্ষে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীকে আইনানুগ ব্যবস্থাগ্রহণের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা প্রদান করবেন।