ই-অরেঞ্জের গ্রাহকদের ক্ষোভ, যা বললেন মাশরাফী

তুলকালাম কাণ্ড। ই-অরেঞ্জ নামে একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নিয়েও নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য দিচ্ছে না। সেই ই-অরেঞ্জের সঙ্গে চুক্তিতে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় নামগুলোর একটি মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা।

তাকে দেখেই হয়তো সেই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মানুষ অনলাইনে পণ্য কেনার প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। তাই পণ্য না পেয়ে এখন তারা জড়ো হচ্ছেন মাশরাফীর বাড়ির সামনে। ই-অরেঞ্জের সঙ্গে চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ায় মাশরাফীর এ বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় কিছু করার না থাকলেও সাধারণ মানুষদের পাশে থাকবেন বলে জানিয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক। পণ্য যাতে গ্রাহকদের হাতে তুলে দেওয়া যায় এখন সেই চেষ্টা করছেন তিনি।

মাশরাফী ছয় মাসের চুক্তি করেছিলেন ই-অরেঞ্জের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে। ১ জুলাই তার মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে মাশরাফীর সংশ্লিষ্টতা থাকায় পণ্য না পেয়ে এবার এই ক্রিকেটারের বাড়ির সামনে হাজার দুয়েক লোক জড়ো হন। অনেকে তার ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন বলেও জানান বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল ওয়ানডে অধিনায়ক।

এরপর নিজেই এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া শুরু করেন। ধারণা করেন কিছু একটা হয়তো ভুল হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভে মাশরাফি বলেন, ‘এত এত ফোন দেখে আমি একটু বিষয়টি জানার চেষ্টা করি। বুঝলাম হয়তো এমন কিছু ঘটেছে। কিন্তু তাদের সঙ্গে আমার ছয় মাসের চুক্তি শেষ হয়ে গেছে। তাদের সঙ্গে আমার ১ জুলাই চুক্তি শেষ হয়ে গেছে।’

চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ায় আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়ে মাশরাফী এ বিষয়ে কিছু করতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন। তবে তিনি সাধারণ মানুষের যাতে ভালো হয় সেটার চেষ্টা করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

মাশরাফী বলেন, ‘আইনি প্রক্রিয়ায় আমার কিছু করার নেই। কিন্তু আমি সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে চাই। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করব তাদের জন্য কিছু করতে।’

তিনি আরও বলেছেন, ‘দুপুর থেকে আমি চেষ্টা করছি। মালিকের সঙ্গে কথা বলেছি। উনি আমাকে বলেছেন উনাদের মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে। ১৯ তারিখ থেকে ডেলেভারি দেওয়া শুরু করবে। এরপর তো আর বেশি কিছু বলার থাকে না। সাধারণত যখন চুক্তি স্বাক্ষর হয়। সিইও এসে চুক্তি করে। আমার অ্যাজেন্ট নাফিসের মাধ্যমে সাজু ভাই যিনি নাটক করে উনি এসেছিলেন। এরপর চুক্তি করেছি।’

ই-অরেঞ্জের মালিকানা পরিবর্তনসহ কর্তৃপক্ষের কোনো খোঁজ না পেয়ে বিক্ষোভ করেছেন ই-অরেঞ্জে অর্ডার করে পণ্য বুঝে না পাওয়া ভুক্তভোগী গ্রাহকরা।

সোমবার (১৬ আগস্ট) গুলশান-১ এর ১৩৭ নম্বর রোডে অবস্থিত ই-অরেঞ্জের কার্যালয় রোড এবং গুলশান-২ চত্বর আটকে আন্দোলন করেন ভুক্তভোগীরা।

বিক্ষুব্ধ ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারের চেয়ে অনেক কম মূল্যে মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য অনেক পণ্যের বিপরীতে প্রায় ২০০ কোটি টাকার অর্ডার নেওয়ার পর ই-অরেঞ্জের মালিক ও কর্মকর্তারা লাপাত্তা। তাই লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেও এখন তাদের দিন কাটছে দুশ্চিন্তায়। নিরূপায় হয়ে সোমবার দিনভর ক্রেতারা বিক্ষোভ করেছেন ই-অরেঞ্জের গুলশানের কার্যালয়ের সামনে।

তারা বলছেন, বারবার ডেলিভারির প্রতিশ্রুতির পরও পণ্য না পেয়ে বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছেন। এমন অবস্থায় ১৯ আগস্ট থেকে পর্যায়ক্রমে ডেলিভারির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ই-অরেঞ্জ।

কেউ চার মাস কেউ তারও আগে অর্ডার দিয়েও পণ্য বুঝে পায়নি। প্রতিষ্ঠানের মালিক বিদেশে চলে যাবেন এমন খবরে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা জড়ো হয়েছেন গুলশানের ই-অরেঞ্জের অফিসের সামনে। অফিসে কোনো লোকজন না পেয়ে গুলশান থানায় গিয়েছেন অভিযোগ দিতে।

এক গ্রাহক অভিযোগ করে বলেন, ‘আমি গত এপ্রিল মাসে ই-অরেঞ্জে তিনটি বাইক অর্ডার করি, তাদের নিয়মঅনুযায়ী ৩৫ দিনের ভেতরে আমার বাইক পাওয়ার কথা থাকলেও ১০০ দিনের বেশি হয়ে গেলেও আমি আমার পণ্য পাইনি। এখন তাদের অফিসে এসে কোনো সঠিক তথ্য পাচ্ছি না। পণ্যটি কবে পাবো সে ব্যাপারেও তারা কোনো কিছু বলছে না। প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবো।’

অভিযোগ দিতে না পেরে ভুক্তভোগী কয়েকশো ক্রেতা গুলশান-২ চত্বর আটকে স্লোগান দেয়। এতে যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে মিছিল নিয়ে গুলশান-১ চত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। সেখান থেকেও পুলিশ সরিয়ে দিলে তারা আবারও অবস্থান নেয় ই-অরেঞ্জের অফিসের সামনে। তাদের দাবি, পণ্য বা টাকা ফেরত পাওয়ার।

ই-অরেঞ্জ নিয়ে নতুন করে আলোচনায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক সফল অধিনায়ক ও সংসদ সদস্য মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-অরেঞ্জের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। ভুক্তভোগীদের দাবি, মাশরাফীর কথা শুনে প্রতিষ্ঠানটি থেকে পণ্য কেনার জন্য টাকা দিয়েছেন তারা। কিন্তু এখন ই-অরেঞ্জ তাদের পণ্য ডেলিভারি অথবা অর্থ ফেরত দিচ্ছে না।

যদিও ই-অরেঞ্জ সোমবার (১৬ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজেদের অফিসিয়াল পেজে এক পোস্টে জানিয়েছে, মাশরাফীর সঙ্গে এখন আর সম্পর্ক নেই তাদের।

তারা লিখেছে, ‘ই-অরেঞ্জ.সপ এর সকল সম্মানিত গ্রাহকদের জানানো যাচ্ছে যে, ই-অরেঞ্জ.সপ এর সাথে পহেলা জুলাই, ২০২১ হতে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার সাথে চুক্তি শেষ হয়েছে। তাই আমাদের অফিসিয়াল কোনো বিষয়ে তিনি কোনোভাবেই অবগত নন এবং তিনি অফিসিয়ালভাবে কোনো কিছুই আপডেট দিতে পারবেন না। আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি তাদের কাছে যারা পণ্য অর্ডার করেছেন, কিন্তু এখনো পণ্য হাতে পাননি।’

প্রতিষ্ঠানটি আরও লিখেছে, ‘আশা করি আমরা দ্রুত এই সমস্যাগুলোর সমাধান খুঁজে বের করবো এবং আপনাদের পণ্য আপনাদের বুঝিয়ে দিতে পারবো। আর যেহেতু জনাব মাশরাফি বিন মুর্তজা আমাদের সাথে আর চুক্তিবদ্ধ নেই, সেহেতু সবার কাছে অনুরোধ রইল এই বিষয়ে তার সাথে যোগাযোগ না করার জন্য।’

ই-অরেঞ্জ লিখেছে, ‘১৯ আগস্ট থেকে সকল পণ্য (মোটরসাইকেল বাদে, মোটরসাইকেলের টাকা রিফান্ড হবে ধারাবাহিকভাবে) সরবরাহ শুরু হয়ে যাবে। গ্রাহকদের সাময়িক অসুবিধার জন্যে আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। ই-অরেঞ্জ.সপ এর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস রাখার জন্যে আপনাদের ধন্যবাদ।’

চুক্তি শেষ হওয়ার পরও মাশরাফীর ছবি ব্যবহার করায় দুঃখ প্রকাশ করে তারা লিখেছে, ‘আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত, চুক্তি শেষ হওয়ার পরও জনাব মাশরাফির ছবি ব্যবহার করার জন্যে। সবাই ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন।’

এর আগে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে মাশরাফীর কাছে পাঠানো এক খোলা চিঠিতে বলা হয়, ‘প্রিয় মাশরাফী ভাই, আপনার সদয় অবগতির জন্য অতি দুঃখের সাথে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের লক্ষ কোটি যুবকের আইডল আপনি। আপনার প্রতি আমাদের অগাধ বিশ্বাস এবং আস্থা আছে। বাংলাদেশে ই-অরেঞ্জ নামক ই-কমার্স আছে অনেকেই জানতাম না। শুধু আপনাকে এম্বাসেডর দেখে আমরা আস্থার সাথে ই-অরেঞ্জ থেকে অর্ডার করি। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে গত মে মাস থেকে এই পর্যন্ত সকল অর্ডারকৃত পণ্যের ডেলিভারি বন্ধ রেখেছে শুধুমাত্র লকডাউনের অজুহাতে। যেখানে অন্য ই-কমার্স তাদের ডেলিভারি নিয়মিত রেখেছে।’

চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘গত ১১ আগস্ট তারিখে আমাদের কিছু লোক (গ্রাহক) তাদের অফিসে গিয়েছিল। তখন তারা এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছিল ১৬ আগস্ট অর্ডারকৃত লিস্ট ঘোষণা করবে এবং ১৭ আগস্ট তারিখ থেকে ডেলিভারি দিবে। সবাই আনন্দের সাথে তাদের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিলাম কিন্তু এরপরপরই সকলের স্বপ্ন ভেঙ্গে দিয়ে ই-অরেঞ্জ যে নোটিশ দিয়েছে তাতে আমাদের সকলের মনের ভেতর একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তারা আরো ৪৫-৬০ কর্মদিবস সময় চাচ্ছে যা দিন হিসেবে প্রায় ৩/৪ মাস। এর পুরোটাই অযৌক্তিক এবং খুবই দুঃখজনক। এই অবস্থায় আমরা আপনার সদয় সহযোগিতা কামনা করছি। আশা করি আপনি ই-অরেঞ্জ কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে হাজার হাজার গ্রাহকের স্বপ্ন পূরণ করতে সক্ষম হবেন। আমাদের সর্বশেষ আশা, আস্থার জায়গা একমাত্র আপনি। আপনার প্রতি আস্থা ভরসা নিয়েই বিনীত প্রার্থনা।’