ইসরাইল-তুরস্ক গভীর সম্পর্ক, আমিরাতকে কেন হুমকি?

ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের হুমকি দিয়েছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইপ এরদোয়ান। অথচ ইসরাইলের সঙ্গে তুরস্কের গভীর সম্পর্কের কি হবে তা নিয়ে কিছুই বলেননি তিনি। এরদোয়ানের এমন আচরণকে ভণ্ডামি বলে আখ্যা দিয়েছেন সমালোচকরা।

ইসরাইল-আমিরাত চুক্তিতে আবুধাবির দাবি ছিল পশ্চিমতীরে তেল আবিবের সার্বভৌম প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বাতিল করা। আবুধাবির এমন দাবির জবাবে আমিরাত থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে ফিলিস্তিনে জরুরি তলব করে মাহমুদ আব্বাস প্রশাসন।

তুর্কি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমিরাত-ইসরাইল চুক্তিকে ফিলিস্তিনিদের স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে আখ্যা দিয়েছে। পশ্চিম তীর, গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দেশটির শক্তিশালী অবস্থান। অন্যদিকে ইসরাইলের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক বলবৎ রেখে চলেছে আঙ্কারা।

তুরস্কের এমন আচরণকে ভণ্ডামি আখ্যা দিয়েছেন দি মিডল ইস্ট সেন্টর ফর রিপোর্টিং অ্যান্ড অ্যানালিস্টের নির্বাহী পরিচালক সেথ জে. ফ্রান্টজমান। বলেন, তুরস্ক, আমিরাতের নিন্দা জানিয়েছে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে আলোচনা শুরু করতে। যদিও তুরস্ক-ইসরাইলের মধ্যে বহু আগে থেকেই সম্পর্ক বিদ্যমান।

ইসরাইলের সঙ্গে তুরস্কের কূটনীতিক সম্পর্ক ১৯৪৯ সাল থেকে। দেশ দুটির মধ্যে আস্থা সংকটের পরও গেলো ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে এ সম্পর্ক বিদ্যমান। বিশেষ করে ২০১০ সালে মাভি মারমারা দুর্ঘটনার পরও। সে সময় ইসরাইলের কমান্ডো বাহিনী তুরস্কের ত্রাণবাহী একটি জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। এতে ১০ তুর্কি স্বেচ্ছাসেবী মারা যায়। গেলো বছর দেশ দুটির মধ্যে ৬শ’ কোটি মার্কিন ডলারের বাণিজ্য হয়েছে। ইসরাইলে রপ্তানিকারক শীর্ষ ১০ দেশের একটি তুরস্ক।

গেলো দু’বছর ধরে তাদের মধ্যেকার সম্পর্ককে কিছুটা অবনতি দেখা যায়। তেল আবিব থেকে ইসরাইলের রাজধানী জেরুজালেমে হস্তান্তরে মার্কিন স্বীকৃতি এবং গাজায় ইসরাইলি নীতি এর মূল কারণ। রাষ্ট্রদূত না থাকলেও ভারপ্রাপ্ত দূতের মাধ্যমে নিজেদের কাজ চালিয়ে নিচ্ছে তেল আবিব-আঙ্কারা।

ফ্রান্টজমান বলেন, তুরস্কের আর্থিক দূরাবস্থা থেকে দেশটির সাধারণ মানুষের দৃষ্টি সরাতে এমন তিরষ্কারের আশ্রয় নিয়েছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। তুরস্ক এখন দেশটির ক্ষমতাসীন দলের আদর্শে পরিচালিত হচ্ছে। যে আদর্শ দেশটিকে অতিমাত্রায় ইসরাইলবিরোধী জাতি হিসেবে পরিণত করছে।

‘সম্প্রতি আয়া সোফিয়াকে মসজিদে ফেরানোর পর আল আকসা উদ্ধারের ঘোষণা দেন এরদোয়ান। তার এ ঘোষণার উদ্দেশ্য হলো ইসলামপন্থীদের দলে টেনে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানো। অটোমান শাসনামলের ধর্মীয় এবং জাতায়তাবাদী এবং যুদ্ধের মানসিকতা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়া। বলেন ফ্রান্টজমান।

১৩ আগস্ট ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে, তুরস্কের বিরুদ্ধে হামাসের ৭ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে তুর্কি নাগরিকত্ব দেয়ার অভিযোগ আনা হয়। আঙ্কারার পদক্ষেপে প্রতিবেদনে উদ্বেগ জানানো হয়। বলা হয়, এ ধরনের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে আক্রমণের জন্য হামাসকে সহায়তা করা হচ্ছে। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে তুর্কি সরকার।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র হামাসকে সন্ত্রাসীগোষ্ঠী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। কিন্তু আঙ্কারা হামাসকে বৈধ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করেন। তুরস্কের মাটিতে সংগঠনটির অবস্থান নিয়ে আঙ্কারাকে বহুবার সতর্ক করেছে পশ্চিমা জোটের সদস্যরা।

ফ্রান্টজমান মনে করেন, ওই অঞ্চলে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার জন্য হামাসকে সমর্থন করে তুরস্ক। আর ন্যাটো জোটে থাকা, ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সুসম্পর্ক ধরে রাখার জন্য ইসরাইলের সঙ্গে মিত্ররা বজায় রেখে চলেছে আঙ্কারা।

‘আঙ্কারার মূল উদ্দেশ্য হলো আরব বিশ্বে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ইসরাইলবিরোধিতাকে প্রধান হাতিয়ার মনে করছে তুরস্ক। একইভাবে ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা দূর করার মাধ্যমে আঞ্চলিক আধিপত্য বাড়াতে চায় ইরান। তুরস্ক-ইরান কেউ ফিলিস্তিনিদের জন্য ভালো কিছু করতে পারবে না। তারা শুধু আশ্বাস আর শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ নষ্ট করছে।’ বলেন ফ্রান্টজমান।

ফ্রান্টজমান বলেন, ইসরাইল-সিরিয়াসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন সংকট সমাধানে তুরস্ক এক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সেই ভূমিকা থেকে ছেড়ে আঙ্কারার নতুন পদক্ষেপকে দুঃখজনক বলে মনে করেন তিনি।

ইসরাইল-তুরস্কের মধ্যে কৌশলগত কার্যকরি সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে। এক দশক আগে মাভি মারমারা সংকটের পর ইসরাইলের পতাকাবাহী ইএল এএল পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। গেলো মে থেকে ইস্তাম্বুল এবং তেল আবিবের মধ্যে সেই জাহাজ সপ্তাহে দু’দিন করে চলাচল করছে।

‘তুরস্ক সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রথম মুসলিম দেশ যারা ইসরাইলের সঙ্গে প্রথম কূটনীতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। বর্তমান এরদোয়ান ক্ষমতাসীন দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির শাসনামালেও তা পরিবর্তন হয়নি। আমিরাত আজকে যা করেছে তুরস্ক ৭০ বছর আগে থেকেই সেসব করে আসছে; ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়ার মাধ্যমে।’ বলেন, কিংস কলেজ লন্ডনের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো বিল পার্ক।

ফ্রন্টজমান বলেছেন, তুর্কি একে পার্টির শাসনামলে ইসরাইলের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্যিক সম্পর্ক অব্যাহতভাবে বাড়ছে। পার্ক শঙ্কা প্রকাশ করেন আমিরাত ইস্যুতে আঙ্কারার অবস্থান ইসরাইলের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাহলে কেনো এরদোয়ান এমন বাকযুদ্ধে, হুমকিতে জড়োলেন? পার্ক বলেন, এরদোয়ান ইতোমধ্যে লিবিয়া ইস্যুতে আমিরাত এবং কাতারের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়েছে। মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন দেয়ায় সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গেও। চলমান দুশ্চিন্তার কারণেই এরদোয়ানের হুমকি-ধমকি। তিনি ইসরাইলকে পছন্দ করেন না। পশ্চিমতীরে তাদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠারও বিরোধী তিনি। মনে হচ্ছে বর্তমান পদক্ষেপের মাধ্যমে ঘরে-বাইরে নৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে ফায়দা নিতে চাচ্ছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট।

পার্কি মনে করেন, ওমান, বাহরাইন এবং কুয়েতের মতো অন্য আরব রাষ্ট্রগুলো যদি আমিরাতকে অনুসরণ করে তাহলে এরদোয়ান আবারো একলা হয়ে যাবেন।

‘ইরানের বৈরি আচরণ এবং শত্রুতার কারণে আমিরাত বড় ধরনের আতঙ্কে রয়েছে। ইসরাইলেরও একই অবস্থা। দু’দেশের প্রকাশ্যে এক হওয়াতে এ মিলটি কাজ করেছে। ফিলিস্তিনের অধিকার আদায়ে পাশে দাঁড়ানোর চাইতে এখন নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে অগ্রসর হতে পারে অনেক আরব দেশ। এতে আঞ্চলিকভাবে তুরস্ক আবারো একটি কঠিন পরিস্থিতি পড়তে পারে। যদিও তেহরান এবং আঙ্কারার মধ্যে কিছুটা পারস্পরিক সন্দেহ, বৈরিতা রয়েছে। তারপরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় ইরানকে বিশেষভাবে সহায়তা দিয়েছে এবং দিচ্ছে তুরস্ক।’ বলেন পার্ক।

পার্ক বলেন, এরদোগান যদি নিজের স্বার্থে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে থাকেন বা জনমতের ওপর বিষয়টি ছেড়ে দেন, তাহলে তুরস্কের অর্থনৈতিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আঞ্চলিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে আঙ্কারা প্রশাসন।

এরদোয়ানের বর্তমান পদক্ষেপ কখনাই আঞ্চলিক সংকট বা তুরস্ক যে সমস্যায় ভুগছে সেগুলোর সমাধান দিতে পারবে না। মনে করেন পার্ক।