ইউজিসির দুই বিকল্প; উচ্চশিক্ষায় হারিয়ে যাচ্ছে এক বছর

করোনাভাইরাসের কারণে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অন্তত এক বছরের সেশনজট সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আার সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আরও অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। সেক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের জীবন থেকে অন্তত এক সেমিস্টার পুরোপুরি চলে যেতে পারে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সঠিক পরিকল্পনা এবং আন্তরিক হলে এ ক্ষতি এড়ানো সম্ভব বলে মত অনেকের।

জানা গেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে অক্টোবর-নভেম্বরে নতুন সেমিস্টার শুরু করা যাবে। তবে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রলম্বিত হবে বিদ্যমান সেমিস্টার। কেননা প্রতিষ্ঠান খুললেই পরীক্ষা নেয়া যাবে না। দেড়-দুই মাসের প্রস্তুতির প্রয়োজন রয়েছে।

ইউজিসি সূত্র জানিয়েছে, উচ্চশিক্ষার ক্ষতি কমাতে দুই বিকল্প ভাবনা উঠে এসেছে। প্রথমত, সাধারণ ছুটির আগে শেষ করা কোর্সের ওপর চলতি সেমিস্টারের পরীক্ষা নিয়ে রাখা। এটি সম্ভব হলে ছয় মাসের সেশনজট কমে যাবে। এরপর জুলাইয়ে শুরু হওয়া সেমিস্টারের পাঠদান অনলাইনে নেয়া। এ দুটি বাস্তবায়িত হলে সেশনজট হবে না।

অন্য বিকল্প হচ্ছে- সেশনজট মেনে নিয়ে দুই বছরের পরিকল্পনা করা। সেটি হচ্ছে- ক্যাম্পাস সচল হলে শ্রেণি কার্যক্রম ও ল্যাব ওয়ার্ক সাধারণভাবে চলবে। এক্ষেত্রে কোর্সের কিছু ‘টপিক’ বাদ দেয়া যেতে পারে। এভাবে ছয় মাসের সেমিস্টার চার মাসে নিয়ে আসা যাবে। সেক্ষেত্রে ৯ মাস থেকে এক বছরের জট তৈরি হলেও দুই বছরে পূরণ সম্ভব হবে।

গত ১৭ মার্চ থেকে করোনার কারণে বন্ধ আছে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ৬ আগস্ট পর্যন্ত এ ছুটি বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে না। একাদশ শ্রেণির ভর্তি ও এইচএসসি পরীক্ষা কবে হবে তাও অনিশ্চিত। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৬ আগস্টের পর ছুটি না বাড়লেও ৯ মাস থেকে এক বছরের সেশনজট হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বলেন, উচ্চশিক্ষায় ক্ষতি রোধে আমরা কোন পরিকল্পনা নিয়ে আগাব, তা নির্ধারণ করবেন ভিসিরা। আমাদের অনেক চিন্তা আছে। কিন্তু কিছুই চাপিয়ে দেব না। তাদের সঙ্গে আলাপ করবেন বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, নিশ্চয়ই তাদেরও চিন্তাভাবনা আছে, সেটা শুনব। এজন্য ২৫ জুন ভার্চুয়াল বৈঠক আয়োজন করা হয়েছে। সেশনজট দূর হবে বিশ্ববিদ্যালয় কতটা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করছে তার ওপর। ‘স্মার্ট’ নেতৃত্ব এবং আন্তরিকতা খুবই দরকার। আমি মনে করি, এই জটের ধকল সামলাতে দুই বছরের পরিকল্পনা প্রয়োজন।

তথ্য মতে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা ও ক্লাস নেয়ার অনুমতি দিয়েছে ইউজিসি। ৮৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন উপায়ে পরীক্ষা নেয়ার অনুমতি পেয়েছে। তবে ল্যাবভিত্তিক ব্যবহারিক পরীক্ষা স্থগিত থাকবে। কেউ পরীক্ষা দিতে না পারলে জরিমানা ছাড়া পরীক্ষা নিতে হবে। ফল প্রকাশ হলে জুলাইয়ে পরবর্তী সেমিস্টার শুরুর অনুমতিও দেয়া হয়েছে। ক্লাস নিতে হবে অনলাইনে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনাল (বিইউপি) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ অনলাইনে শতভাগ কার্যক্রম চালাচ্ছে। এছাড়া কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও সাড়া মিলছে না। মূলত শিক্ষার্থীদের মনো-সামাজিক অবস্থা, অনলাইন ক্লাসের সামগ্রীর সংকটসহ নানা কারণে এমনটি হয়েছে। শিক্ষকদের অনলাইনে ক্লাস নেয়ায় অনীহাও অন্যতম একটি কারণ বলে মত সংশ্লিষ্টদের।

শিক্ষার্থীরা জানান, বিশেষ ব্যবস্থায় পরীক্ষা দিতে তারা রাজি। তবে প্রস্তুতির জন্য দেড়-দুই মাস সময় দিতে হবে। অনলাইনে ক্লাস নিলে অনেকেই অংশ নিতে পারবেন। তবে প্রধান বাধা হচ্ছে ইন্টারনেটের গতি এবং দাম। ইতোমধ্যে ইন্টারনেটের দাম বেড়েছে। ইন্টারনেটের দাম কমানো এবং পড়ালেখার ডিভাইস সরবরাহ করা সম্ভব হলে সুবিধা হয় বলেও তারা জানান।

নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আতিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের অনলাইন ক্লাসে উপস্থিতি প্রায় ৮৫ শতাংশ। অনেক দিনমজুরের সন্তানও বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে। তাই বেসরকারি শিক্ষার্থী মানেই আর্থিকভাবে সক্ষম তা নয়। এজন্য ইন্টারনেটের দাম কমানো জরুরি। এটাকে উচ্চশিক্ষায় প্রণোদনা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

আর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেন, অনলাইন শিক্ষা ক্যাম্পাসভিত্তিক উচ্চশিক্ষার বিকল্প নয়। সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। এজন্য ইন্টারনেটসহ অন্যান্য অসুবিধা দূর করা প্রয়োজন। করোনায় সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে উচ্চশিক্ষার বলেও মনে করেন তিনি।