আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় শব্দ এখন ‘হোপ’: রুমানা

পরিশ্রম আমরা কম-বেশি সবাই করি। কিন্তু মনোবল ধরে রাখতে আমরা ক’জনইবা পারি। কোনো কাজে ব্যর্থ হলে আমরা ভেবে নেই কাজটি আর আমাদের দিয়ে হবে না। কেউবা আবার ভাগ্যকে দোষারোপ করতে থাকি। সামান্য বিষয়ের ব্যর্থতায় যেন আমাদের মনে বিষণ্ণতার পাহাড় জমা হতে থাকে।

পরীক্ষায় ভালো ফলাফলে ব্যর্থ, বেকারত্ব, পরিবারের সাথে মতের অমিল, প্রেমে ব্যর্থতা এরূপ অসংখ্য বিষয়ে হতাশায় ভুগতে থাকা মানুষগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর মনোবল খুঁজে পায় না। হয়তোবা এই সমাজের ভয়ে মানুষ নিজেদের মধ্যে হতাশার সমুদ্র তৈরি করতে থাকে; আর সেই সমুদ্রে ডুবে মারা যাওয়াকেই সব হতাশার সমাধান মনে করে। বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ।

বর্তমানে আত্মহত্যার বিষয়টি যেন তরুণ সমাজকে ঘিরে রেখেছে। কিন্তু আত্মহত্যা যে কখনোই ব্যর্থতার সমাধান হতে পারে না; তার অন্যতম দৃষ্টান্ত অদম্যশক্তির অধিকারিণী রুমানা মনজুরের গল্পে বুঝতে পারি।

রুমানা মনজুর। ২০১১ সালে স্বামীর আঘাতে দুই চোখের দৃষ্টি হারিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এই শিক্ষিকা। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে চাওয়ার অপরাধে তার স্বামী নিজ হাতে তার চোখ উপরে ফেলেছিল। কামড়ে দিয়েছিল তার নাক। স্বামীর নির্মম অত্যাচারে অন্ধত্ব বরণ করলেও অটুট রেখেছিলেন তার ইচ্ছা শক্তি।

রুমানা মনজুর তার এক বক্তৃতায় বলেন, আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় চার অক্ষরের একটি শব্দ হলো ‘Hope (আশা)’। জীবনে কিছু সময় আসে যখন সামান্য আশা জীবনকে বাঁচতে শেখায়। হতাশা, বিরহ, বিষণ্ণতা বা আকস্মিক দুর্ঘটনা আমাদের নিজেদের মনের ওপর এবং শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেয়। একটা ভুল পদক্ষেপে নিভে যেতে পারে আপনাদের জীবনের আলো।

তিনি বলেন, বাঙালী প্রতিটি নারীর মতোই আমারও বিবাহের দিনটি নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সব স্বপ্ন এক মুহূর্তে অন্ধকারে পূর্ণ হয়ে যায়, যখন আমার স্বামী আমার গালে থাপ্পড় মারে। আমার দোষ ছিল কেনো তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম সে বিবাহের মঞ্চে ৩ ঘণ্টা দেরিতে এসেছিল। সেদিন চোখ ভর্তি জল আর আঙ্গুলের দাগে রক্তিম বর্ণ গাল নিয়ে একা ঘুমাতে যাই। সেদিনের সেই অন্ধকার যেনো আস্তে আস্তে আমার জীবনের সব আলোকে গ্রাস করে নিচ্ছিল। আমার জীবনে আনন্দের বন্যা নিয়ে জন্ম নিলো আমার কন্যা আনুসা।

‘আমি আমার মেয়েকে শেষ দেখেছিলাম যখন তার বয়স ছিল ৫ আর আমার ৩৩ বছর। আমার চোখে এখনো ভাসে সেদিনের সেই নীল জামা পড়া ছোট্ট মেয়েটার মুখ। আমার স্বামী হঠাৎ আমার মেয়ের সামনে থেকে হাত ধরে আমাকে রুমে নিয়ে যায় আর রুমটি তালা বন্ধ করে দেয়। সে আমার চুল ধরে দেয়ালে আঘাত করতে থাকে। আমি তার কাছে বিচ্ছেদ চাইলে সে তার আঙ্গুল দিয়ে আমার চোখ উপড়ে নেয়, আমার নাকে কামড় বসিয়ে দেয়। রক্তে ভরে যায় সেই কক্ষ।’

তিনি বলেন, সেদিনের সেই ঘটনার পরও আমি আশা ছাড়িনি, মনোবল হারাইনি। আমার চোখের চতুর্থ সার্জারির পর আমি শিখে গিয়েছিলাম কিভাবে অন্ধকারে বাস করতে হয়। সেদিনের পর থেকে আর কোনো হাসি মুখ দেখা হয়নি, দেখা হয়নি আর কোনো সূর্যাস্ত, এমনকি নিজের জীবনের সূর্যোদয়ও নিজ চোখে দেখার সুযোগ হয়নি। দেখা হয়নি আমার মেয়ের ছোট্ট থেকে বড়ো হাওয়ার হাজারো রঙিন দৃশ্য, দেখা হয়নি তার শিক্ষার সাফল্য।

নিজেকে বিখ্যাত সেই গল্পের নায়িকা পানডোরা মনে হয়, যাকে ঈশ্বর একটি বাক্স দিয়ে তার মুখ না খোলার আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সে কৌতুহলের বসে সেই বাক্সের মুখ খুলে ফেলে এবং বাক্সের ভিতরে বন্দী সব দুষ্টতা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। পানডোরা তার ভুল বুঝতে পারলেও ততক্ষণে অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছিল। সে দেখলো বাক্সের ভিতরটা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু তার মনে হলো সেখানে একটা জিনিস রয়েছে তা হলো ‘আশা’। সে তার হাতকে মুষ্টিবদ্ধ করলো আর প্রাণপণ চেষ্টায় দুষ্টতাকে বন্দি করে ফেললো। আমার জীবনটাও ওই ফাঁকা বাক্সের মত যার ভিতরে শুধু একটা জিনিসই রয়েছে; আর তা হলো ‘আশা’।

ঢাবির এই প্রাক্তন শিক্ষিকা বলেন, জীবনের তিনটি বিষয় আমাকে আজকে আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস যুগিয়েছে। বিশ্বাস, মনোবল আর অনুপ্রেরণা। নিজেকে বিশ্বাস করুন, বিশ্বাস করুন এমন কিছুই নেই যা আপনি পারবেন না। মনোবল অটুট রাখুন। জীবনের সব প্রাপ্তিকে মনে করে এগিকে যান। কখনই হতাশ হয়ে পড়বেন না। প্রকৃতি অনেক দয়ালু, বিশ্বাস রাখুন। অন্ধ হয়েও আমি আমার স্নাতকোত্তর শেষ করতে পেরেছি। বাংলাদেশ আমাকে সাহায্য করেছে, কানাডা সরকার আমার ও আমার পরিবারে জরুরি ভিসার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, ইউবিসি আমার মেধাবৃত্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছিল যেন আমি আমার শিক্ষা শেষ করতে পারি এবং আমি আইন বিষয়ে পাশও করি।আমার বাবা আমার সামনে এসে বলেছিল রুমানা আজ তোমার সাফল্যে আমি আঘাত মুক্ত হয়েছি। সেদিনের বাবার চোখে গড়িয়ে পড়া সেই কান্না আমাকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

রুমানা বলেন, কখনই আশা হারাতে নেই। জীবনকে ভালবাসুন নিজেকে ভালবাসুন। মাথা উঁচু করে বাঁচতে শিখুন। আত্মহত্যা কখনোই সমাধান হতে পারেনা। আশাই আমাকে আজকে একজন সক্রিয়বাদী নারী ও আইনজীবী হতে সাহায্য করেছে।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালে রুমানা উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডায় ছিলেন। ছুটিতে দেশে ফিরলে ওই বছরের ৫ জুন ঢাকায় ধানমণ্ডির বাসায় স্বামী হাসান সাইদের নির্যাতনের শিকার হন রুমানা। ওই হামলায় নাকে ক্ষত হওয়ার পাশাপাশি দৃষ্টি শক্তি হারান তিনি। রুমানা স্বামীর নির্যাতনে যখন দৃষ্টিশক্তি হারান, তখন তার একমাত্র মেয়ে আনুশেহের বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। তার চোখের সামনেই ঘটেছিল ঘটনা। সেই মেয়ের বয়স এখন ১৫ বছর।

পুরোপুরি দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর কানাডার ভ্যাংকুভারের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া (ইউবিসি) তাঁর চিকিৎসার উদ্যোগ নেয়। আবার কানাডায় ফেরার পর থেকে রুমানা মনজুরের পথচলা থমকে যায়নি ক্ষণিকের জন্যও। ২০১১ সালে কারাগারেই মৃত্যু হয় রুমানার স্বামী হাসান সাইদের।

দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর বহু বাধা আর জটিলতা মোকাবেলা করে দুই বছরের মাথায় ইউবিসি থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এরপর আইন পড়া শুরু করেন তিনি। এরপর ২০১৯ সাল থেকে তিনি দেশটির বিচার বিভাগে ‘ডিপার্টমেন্ট অব ইন্ডিজেনাস’–এর একজন আইনজীবী হিসেবে বর্তমানে দায়িত্বরত আছেন।

গত মাসে ভ্যাংকুভারভিত্তিক প্রতিষ্ঠান থেকে ‘কারেজ টু কামব্যাক-২০২০’ শীর্ষক সাহসিকতার পুরস্কার পেয়েছেন রুমানা মনজুর। মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য বিষয়ক কোস্ট মেন্টাল হেলথ নামের প্রতিষ্ঠান থেকে মোট ৫টি ক্যাটাগরিতে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে; যার একটি পেয়েছেন রুমানা।

কারেজ টু কাম ব্যাক অ্যাওয়ার্ড-২০২০ (Courage To Come Back Awards 2020)-এ ফিজিক্যাল রিহ্যাবিলেটেশ ক্যাটাগরিতে এ পুরস্কার পান তিনি। এডিকশন, মেন্টাল হেলথ, ইয়ুথ এবং মেডিকেল ক্যাটাগরিতে এই পুরস্কার পেয়েছেন আরও চারজন।

আরোও পড়ুন: কানাডায় সাহসিকতার পুরস্কার পেলেন ঢাবি শিক্ষিকা রোমানা