আবাসিক হলগুলো আগেই খুলে দেবে ঢাবি

করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বন্ধ থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খোলার আগেই আবাসিক হলগুলো খুলে দেয়ার প্রস্তুতি চলছে। হল খুলে দিতে ইতোমধ্যে প্রাধ্যক্ষদের নিয়ে একটি প্রভোস্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটি হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার একটি গাইডলাইন তৈরি করবে। পরিবেশ সন্তোষজনক হলেই বিশ্ববিদ্যালয় খোলার আগে খুলে দেওয়া হবে হল।

এই পরিস্থিতিতে আবাসিক হলগুলোর পরিবেশ ফেরাতে বিদ্যমান গণরুম সংস্কৃতি বন্ধ এবং যেসব শিক্ষার্থীদের গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন হয়েছে তাদের উচ্ছেদ করা হবে। একইসঙ্গে ক্যাম্পাস খোলার আগে ছাত্রত্ব শেষ হওয়া শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ আবাসিক হলের প্রাধ্যক্ষদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নিয়ে হল ছাড়তে বলেছে প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটি।

গত ৮ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘গণরুম সংকট’ নিরসন, করোনাকালীন স্বাস্থ্যবিধি ও জীবনাচারের নিয়মকানুন বাস্তবায়নে অছাত্রদের হল ছাড়া জরুরি বলে এক ভার্চুয়াল সভায় মত দিয়েছেন প্রাধ্যক্ষরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো খোলার পূর্বশর্ত হিসেবে বিভিন্ন হলের স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ, হল প্রাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি ও জীবনাচারবিষয়ক নীতিমালা বা নির্দেশিকা প্রণয়নের ব্যাপারে সভায় আলোচনা হয়।

এছাড়া যাঁদের ছাত্রত্ব নেই, হল খোলার আগে তাঁদের চলে যাওয়ার বিষয়ে সভায় আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া কথিত গণরুমের শিক্ষার্থীদের কীভাবে হলে সংকুলান করানো যায়, সে বিষয়টিও সভায় আলোচিত হয়েছে। পরে এই নিয়ে গত ২৯ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিষদভুক্ত ১৩টি ছাত্রসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বৈঠকে আবাসিক হল খোলা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস কার্যক্রমের বিষয়ে ছাত্র সংগঠনের নেতাদের মতামত নেওয়া হয়। হল খুলে দেওয়ার পাশাপাশি অনলাইন ক্লাসে বৈষম্য কমানোর বিষয়েও আলোচনা হয় ওই বৈঠকে।

এদিকে হল খুলে দিতে প্রাধ্যক্ষদের নিয়ে একটি প্রভোস্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটি হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার একটি গাইডলাইন তৈরি করবে। পরিবেশ সন্তোষজনক হলেই বিশ্ববিদ্যালয় খোলার আগে খুলে দেওয়া হবে হল। পরিবেশ ফেরাতে হলে গণরুম বন্ধ এবং বহিরাগতদের উচ্ছেদ করা হবে।

প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্তরা বলছেন, হলে পর্যাপ্ত আসন না থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় অর্ধেক আবাসিক হলে থাকেন। এই শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ২০টি আবাসিক হল। আসনের চেয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি হওয়ায় প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা ছোট একটি কক্ষে গাদাগাদি করে বাস করেন। এসব কক্ষ গণরুম নামে পরিচিত। যে কক্ষে দুজন শিক্ষার্থী থাকার কথা, সেখানে থাকছেন আট থেকে ১০ জন। মেঝেতে বিছানা পেতে রাতে এসব কক্ষে অবস্থান করেন শিক্ষার্থীরা।

এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বলছেন, করোনাভাইরাস ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় আবাসিক হলগুলোয় ঝুঁকি বাড়ল। করোনা পরিস্থিতিতে গণরুম বা গাদাগাদি করে বাস করার সুযোগ নেই। ফলে আবাসিক হলে শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। না হয় শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকেই যায়।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, ক্যাম্পাস খোলার আগে আবাসিক হলগুলো খুলে দিতে হলে আগের মতো আর গণরুম রাখা যাবে না। গাদাগাদি করে কোনো শিক্ষার্থী হলে থাকতে পারবেন না। যেসব শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে, তাদের হল ছাড়তে হবে। বহিরাগতদেরও হল ছাড়তে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির পরই হলগুলো খুলে দেওয়া হবে।

প্রভোস্ট কমিটির সদস্যসচিব এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘করোনাকালে হল খুললে যে ঝুঁকি, তার অগ্রগতি ও বিশেষজ্ঞদের মতামত সাপেক্ষে করণীয় নির্ধারণ করা হবে। হলগুলোয় ২০ হাজারের মতো শিক্ষার্থী থাকে। তাঁদের ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেই হল খোলা হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের খসড়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হলের কোনো কক্ষের মেঝেতে ঘুমানো যাবে না। দুই সিটের কক্ষে সর্বোচ্চ চার আর চার সিটের কক্ষে সর্বোচ্চ আটজন থাকতে পারবেন। বহিরাগত কাউকে কক্ষে অবস্থান করতে দেওয়া যাবে না। কক্ষের বাইরে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। কক্ষ ও কক্ষের বাইরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। হলের ডাইনিং, ক্যান্টিন, রিডিং রুম, অডিটরিয়াম, মেস, দোকান, সেলুন, টিভি রুম, অতিথি কক্ষ, পাঠাগার, মসজিদ ও উপাসনালয়ে ভিড় করা যাবে না। সভা-সমাবেশ, রেস্তোরাঁ ও গণপরিবহন যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে।

করোনার সংক্রমণের কারণে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগামী ৩ অক্টোবর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। করোনা পরিস্থিতিতে পাঁচ মাসের বেশি সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষা ও শিক্ষার্থীরা গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে। দেশে করোনার সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। লক্ষণও আশাব্যঞ্জক নয়। গত ২০ মার্চ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ওই দিন সব শিক্ষার্থীকে হল ছাড়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।