আইসিসির চেয়ারম্যানের চেয়ারে কে বসতে যাচ্ছেন, পাপন নাকি গ্রেভস!

ক্রিকেট থেকে বিষফোঁড়া বিদায় নিয়েছে সেই ২০১৫ সালে! বিষফোঁড়া সে আবার কে, এমন প্রশ্নই তো ভাবছেন? আসলে বলছি এন শ্রীনিবাসনের কথা। বাংলাদেশের ক্রিকেট সমর্থকদের নিশ্চয়ই মনে আছে ওই প্রতারকটার কথা। ২০১৫ অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল বা আইসিসির সভাপতি হিসেবে বিজয়ী দলের হাতে ট্রফি তুলে দেয়ার কথা ছিলো তৎকালীন বিসিবি সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামালের। কিন্তু তা না করে চেয়ারম্যান পদের ক্ষমতাবলায়ে নির্লজ্জর মতো নিজেই বিজয়ী দল অস্ট্রেলিয়ার হাতে ট্রফি তুলে দেন এন শ্রীনিবাসন। এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইয়ে যায় ক্রিকেট দুনিয়ায়। প্রকৃতির বিচার করেছে। লোভী শ্রীনি আইপিএলে ফিক্সিং বিতর্কে আইসিসির পাশাপাশি বিসিসিআই এর দফতর থেকেও বিতাড়িত হন। এরপরই মূলত আইসিসির সভাপতি পদের বিলুপ্ত করে চেয়ারম্যান পদকে সর্বেসর্বা করার সিদ্ধান্ত নেয় ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থাটি।

ওই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ২০১৬ সালে আইসিসির গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন আনে। বিগ থ্রি বা ক্রিকেটে তিন মোড়লে ক্ষমতা হ্রাস করা হয়। নতুন নিয়মে আইসিসি’র চেয়ারম্যানের চেয়ারকে করা হয় সর্বেসর্বা। বলা হয়, চেয়ারম্যান ২ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। নির্বাচনে ৩ বারের বেশি অংশ নেয়া যাবে না। নির্বাচিত চেয়ারম্যান কোন বোর্ডের সাথেও সংশ্লিষ্ট থাকতে পারবেন না।

ক্ষমতার চেয়ার আবারও ভারতের দখলে যায়। যিনি পেশায় আইনজীবী আবার দক্ষ্য সংগঠক ও সে সময়ে বিসিসিআই এর সভাপতি শশাঙ্ক মনোহরের ওপর পড়ে আইসিসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব। দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালনে ভূমিকা রাখায় দ্বিতীয় দফা আরেকবার হয়েছিলেন ক্রিকেট বিশ্বের সর্বোচ্চ শাসক। চলতি জুনে তার ক্ষমতা মেয়াদ শেষ হবার কথা ছিলো। কিন্তু, বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে সবই হয়েছে এলোমেলো। তাই দুই মাস বাড়তে পারে মনোহরের ক্ষমতা। তৃতীয় দফায় আর শশাঙ্ক মনোহরকে চাইছে না আইসিসি। মনোহরও আবার আইসিসির সাথেও থাকবে না বলে জানিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী মানে মনোহরের স্বদেশ ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই এর বোর্ড কর্তারা মনে করেন শশাঙ্ক মনোহর আবারও আইসিসির ক্ষমতার চেয়ারে বসলে বিসিসিআই এর আর্থিক লাভ নেই, বরং মনোহর থাকাটাই তাদের জন্য হুমকি। কারণ গেলো চার বছরে ভারতের জন্য খুব একটা লাভ হয়নি শশাঙ্ক মনোহর আইসিসির চেয়ারম্যান পদে থাকায়।

কিন্তু, আইসিসির নতুন চেয়ারম্যান চাই। লোভনীয় এই পদের জন্য অনেক নাম শোনা যাচ্ছে। ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড বা ইসিবির চেয়ারম্যান কলিন গ্রেভসের নাম সবচেয়ে আলোনায়। আছেন ভারতীয় ক্রিকেটের সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলিও। ভারতের সাবেক এই অধিনায়ক চেয়ারম্যান প্রার্থী হলে বাকি সবার স্বপ্ন দিবা স্বপ্নে পরিণত হতে পারে। তবে, আইসিসির চেয়ারম্যান পদ নিয়ে নয় সৌরভের মস্তিষ্ক জুড়ে রয়েছে যেকোনো মূল্যে আইপিএল আয়োজন।

তবে হ্যাঁ, আরেকজনের কথা বলতেই হয়। তিনি বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড বা পিসিবি চেয়ারম্যান এহসান মানি’র মনেও কিন্তু স্বপ্ন উকি দিচ্ছে আইসিসির সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি হতে। মানি আইসিসির উঠনে অনেক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। ২০০৩ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আইসিসির সভাপতি ছিলেন। আছেন বর্তমানে আইসিসির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটির দায়িত্বে। যদিও তিনি গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, আইসিসির চেয়ারম্যান পদে বসার ইচ্ছে নেই তার। এতো কিছু পরেও তার এমন মন্তব্য লোক দেখানো।

তবে মাঠের বাইরে টেবিলের খেলায় বেশ এগিয়ে কিন্তু বিসিবি বস সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। কারণ আইসিসি প্রধান হবার আগে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল বা এসিসির সভাপতি পাপন গেলো দুই বছর হলো। আর অন্য বোর্ডগুলোর সাথে বিসিবির সম্পর্ক খুব শক্ত। ওয়েষ্ট ইন্ডিজ বোর্ডের সমর্থন পেতে পারেন পাপন, কারণ কথিত আছে ২০১৮ সালে বিসিবি ক্যারিবীয়দের আর্থিক সংকটে বিসিবি নিজের খরচে সফর করে ছিলো বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। ওই সফরে দুটি টেস্ট সমান তিনটি করে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি খেলেছিলো বাংলাদেশ। কূটনীতিক দক্ষতা আরও আছে ক্রিকেট বোর্ডের। নিরাপত্তার কারণে বিতর্কিত পাকিস্তান সফরে গিয়েও পিসিবির সাথে এখন বিসিবির সম্পর্ক আঠার মতো লেপে গেছে। মনে আছে ২০১৯ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের পরপর জুলাইয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল শ্রীলঙ্কা সফরে গিয়েছিল। কলোম্বোতে ইস্টার সানডেতে গির্জায় দুই দফা বোমা হামলার ঘটনায় প্রায় আড়াইশো মানুষের প্রাণ যায়। নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে তাদের পাশে পরম বন্ধু হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো বাংলাদেশ। সেই থেকে লঙ্কা বাংলার সম্পর্কটা, এ বাঁধন ছিঁড়ে যাওয়ার নয়। জিম্বাবুয়ের বড় ভাইয়ের ভূমিকায় কিন্তু বাংলাদেশ। এটার নিশ্চয় আর ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন নেই। আফগানিস্তানের সম্পর্কটাও কিন্তু আম কাঁঠাল ফলের মতো মধুর। যদিও আফগানদের বড় ভাই ভারত আর বাংলাদেশ মেঝ ভাই। বেশ কয়েকটি বোর্ডের সমর্থন পাবেন নিশ্চিত বিসিবি বস।

তবে নাজমুল হাসান পাপনের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী ইসিবি চেয়ারম্যান কলিন গ্রেভস। তিনি নভেম্বর পর্যন্ত ইসিবির চেয়ারম্যান পদে থাকছেন। এরপর এই দায়িত্বে থাকবেন না বলেই কথা উঠেছে আইসিসির পরবর্তী চেয়ারম্যান হতে যাচ্ছেন কলিন। ভোট বাক্সে জমানোর রাস্তাও বাগিয়ে রেখেছেন। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড আর দক্ষিণ আফ্রিকা তার পক্ষেই থাকবে নিশ্চিত। দান মেরেছেন আরেকটা। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ডিগবাজি দেবে ওয়েষ্ট ইন্ডিজ! করোনার এই আতঙ্কের মাঝে ওয়েষ্ট ইন্ডিজ ইংল্যান্ড সফরে। যদিও বিতর্ক আছে ক্যারিবীরা নাকি ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে সফরে গেছে। সাথে কি ভোটটাও চলে গেল কিনা বিসিবির ভাবনা এটা।

সৌরভ গাঙ্গুলিকে অনেকে ভাবলেও তিনি হচ্ছেন না কারণ ভারত তাদের ক্রিকেট বাণিজ্য টিকে রাখতে টানা তৃতীয়বার স্বদেশী কাউকে চাইবে না! তাই সার্বিক দিক বিবেচনা করে ইসিবি চেয়ারম্যান কলিন গ্রেভসের পর বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সম্ভাবনা অত্যাধিক। কে হতে যাচ্ছেন ক্রিকেট বিশ্বের সর্বোচ্চ শাসক এটার জন্য অপেক্ষা জুলাই মাস পর্যন্ত। তবে, হ্যাঁ আইসিসির চেয়ারম্যান চেয়ার নিয়ে অতীতে যে নাটক মঞ্চায়ন হয়েছে। সেক্ষেত্রে অখ্যাত কেউ হলেও অবাক হবো না।